কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা AI দ্রুত বদলে দিচ্ছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ব্যবহার ও কনটেন্ট তৈরির ধরন। ছবি, ভিডিও, লেখা ও অডিও তৈরির পাশাপাশি এখন AI-ভিত্তিক অ্যালগরিদম ব্যবহারকারীর পছন্দ অনুযায়ী কনটেন্ট দেখানো, বিজ্ঞাপন নির্ধারণ এবং বিভিন্ন ধরনের তথ্য সাজানোর ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। ২০২৬ সালের Reuters Institute Digital News Report-এর তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বব্যাপী অনলাইন সংবাদ পাওয়ার ক্ষেত্রে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও ভিডিও নেটওয়ার্ক এখন প্রথমবারের মতো সংবাদ সংস্থাগুলোর নিজস্ব ওয়েবসাইট ও অ্যাপকে ছাড়িয়ে গেছে। ৪৮টি বাজারের গড় হিসাবে ৫৪ শতাংশ মানুষ গত সপ্তাহে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও ভিডিও নেটওয়ার্কের মাধ্যমে সংবাদ পেয়েছেন, যেখানে সংবাদ সংস্থার ওয়েবসাইট ও অ্যাপ ব্যবহার করেছেন ৫১ শতাংশ।
AI-এর প্রভাবও এই তথ্য ব্যবস্থায় স্পষ্ট হয়ে উঠছে। একই প্রতিবেদনে দেখা গেছে, ChatGPT, Google Gemini ও Perplexity-এর মতো AI chatbot ব্যবহার করে সংবাদ পাওয়ার হার এক বছরে ৭ শতাংশ থেকে বেড়ে ১০ শতাংশ হয়েছে। ৩৫ বছরের কম বয়সীদের মধ্যে এই হার আরও বেশি—১৬ শতাংশ। তবে AI chatbot থেকে পাওয়া সংবাদের প্রতি আস্থা এখনও তুলনামূলক কম; বিশ্বব্যাপী মাত্র ২০ শতাংশ মানুষ AI chatbot-এর মাধ্যমে পাওয়া সংবাদকে সাধারণত বিশ্বাসযোগ্য মনে করেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে AI-এর সবচেয়ে দৃশ্যমান পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে কনটেন্ট তৈরিতে। এখন কয়েকটি নির্দেশনা দিয়েই বাস্তবসম্মত ছবি, ভিডিও, ভয়েস ও লেখা তৈরি করা সম্ভব। ফলে সাধারণ ব্যবহারকারী থেকে শুরু করে কনটেন্ট ক্রিয়েটর ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান—অনেকেই দ্রুত কনটেন্ট তৈরিতে AI ব্যবহার করছেন।
তবে এর সঙ্গে বাড়ছে AI-generated content বা ‘AI slop’-এর পরিমাণ। Reuters Institute-এর ২০২৬ সালের Journalism, Media and Technology Trends প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, TikTok জানিয়েছে তাদের প্ল্যাটফর্মে ইতোমধ্যে এক বিলিয়নের বেশি AI-generated ভিডিও রয়েছে। একই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিশ্বব্যাপী দ্রুত বেড়ে ওঠা কিছু YouTube চ্যানেলের উল্লেখযোগ্য অংশ শুধু AI-generated ভিডিও প্রকাশ করছে। এই পরিস্থিতিতে সবচেয়ে বড় উদ্বেগ তৈরি হয়েছে ভুয়া তথ্য ও Deepfake নিয়ে। AI ব্যবহার করে এমন ছবি ও ভিডিও তৈরি করা সম্ভব হচ্ছে, যা বাস্তব ঘটনার সঙ্গে খুব সহজেই গুলিয়ে যেতে পারে। ২০২৬ সালে বিভিন্ন সংঘাত ও রাজনৈতিক ঘটনার সময় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে AI-generated ছবি, ভুয়া ভিডিও এবং কৃত্রিম বক্তব্য ছড়িয়ে পড়ার ঘটনা নিয়ে গবেষকরাও উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন।
ভুয়া তথ্যের এই প্রবণতার প্রভাব মানুষের আস্থাতেও পড়ছে। Reuters Institute-এর প্রতিবেদনে দেখা গেছে, বিশ্বব্যাপী ৬২ শতাংশ মানুষ অনলাইনে ভুয়া বা বিভ্রান্তিকর তথ্য নিয়ে উদ্বিগ্ন, যা আগের বছরের তুলনায় ৪ শতাংশ পয়েন্ট বেশি। একই প্রতিবেদনে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও AI chatbot থেকে পাওয়া সংবাদের প্রতি আস্থার হার যথাক্রমে ২২ শতাংশ ও ২০ শতাংশ বলে উল্লেখ করা হয়েছে। এই ঝুঁকি মোকাবিলায় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমগুলো AI-generated content শনাক্ত ও লেবেল করার দিকে জোর দিচ্ছে। Meta জানিয়েছে, তারা AI-generated content শনাক্ত ও লেবেল করার প্রযুক্তি নিয়ে কাজ করছে এবং ২০২৬ সালের জুলাইয়ে EU AI Act-এর AI generated content transparency code-এ যুক্ত হওয়ার ঘোষণা দিয়েছে।
তবে শুধু AI লেবেল করলেই সমস্যার সমাধান হচ্ছে না। ২০২৬ সালের একটি AI Forensics গবেষণায় TikTok ও Instagram-এ AI-generated কনটেন্টের লেবেলিং নিয়ে সীমাবদ্ধতার কথা উঠে এসেছে। গবেষণায় দেখা গেছে, তাদের বিশ্লেষণ করা কিছু AI-generated কনটেন্ট যথাযথভাবে লেবেল করা হয়নি। অন্যদিকে AI সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শুধু ঝুঁকি তৈরি করছে না, নতুন সুযোগও তৈরি করছে। কনটেন্ট ক্রিয়েটররা দ্রুত ভিডিও ও গ্রাফিক্স তৈরি করতে পারছেন, ছোট ব্যবসা কম খরচে বিজ্ঞাপন ও প্রচারণার কনটেন্ট তৈরি করতে পারছে এবং ব্যবহারকারীরা নিজেদের প্রয়োজন অনুযায়ী আরও ব্যক্তিকেন্দ্রিক অভিজ্ঞতা পাচ্ছেন।
তবে ভবিষ্যতের বড় চ্যালেঞ্জ হবে বাস্তব ও কৃত্রিম কনটেন্টের পার্থক্য বোঝা এবং তথ্যের বিশ্বাসযোগ্যতা নিশ্চিত করা। বিশেষজ্ঞরা তাই কনটেন্টের উৎস ও পরিবর্তনের ইতিহাস শনাক্ত করার জন্য C2PA-এর মতো digital provenance বা content authenticity প্রযুক্তির ওপর গুরুত্ব দিচ্ছেন। Reuters Institute-এর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের শুরুতে বিশ্বব্যাপী প্রকাশিত সংবাদ ছবি ও ভিডিওর ১ শতাংশেরও কমে C2PA metadata যুক্ত ছিল। সব মিলিয়ে AI সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমকে আরও দ্রুত, ব্যক্তিকেন্দ্রিক ও সৃজনশীল করে তুলছে। একই সঙ্গে এটি ভুয়া তথ্য, Deepfake ও আস্থার সংকটের মতো নতুন সমস্যাও তৈরি করছে। ফলে ভবিষ্যতের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে AI-এর সাফল্য শুধু কত বেশি কনটেন্ট তৈরি করা যায় তার ওপর নির্ভর করবে না; বরং কোন কনটেন্ট সত্য, কোনটি কৃত্রিম এবং ব্যবহারকারী কীভাবে তা বুঝতে পারবেন—সেই স্বচ্ছতা ও বিশ্বাসযোগ্যতার ওপরও নির্ভর করবে।
