স্বাস্থ্যসেবায় দ্রুত পরিবর্তন আনছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI), টেলিমেডিসিন, ডিজিটাল স্বাস্থ্যব্যবস্থা ও আধুনিক চিকিৎসা প্রযুক্তি। রোগ নির্ণয় থেকে শুরু করে রোগীর তথ্য ব্যবস্থাপনা, দূরবর্তী চিকিৎসা পরামর্শ এবং চিকিৎসা সংক্রান্ত সিদ্ধান্তে সহায়তা বিভিন্ন ক্ষেত্রে প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (WHO) সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, স্বাস্থ্যসেবায় AI-এর ব্যবহার ইতোমধ্যে উল্লেখযোগ্য পর্যায়ে পৌঁছেছে। WHO European Region-এর ৫৩টি দেশের ওপর করা এক মূল্যায়নে দেখা গেছে, প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ দেশ রোগ নির্ণয়ের ক্ষেত্রে AI ব্যবহার করছে এবং প্রায় অর্ধেক দেশে AI-ভিত্তিক রোগী চ্যাটবট চালু হয়েছে। তবে একই সময়ে মাত্র ৮ শতাংশ দেশের স্বাস্থ্য খাতে নির্দিষ্ট AI কৌশল বা strategy রয়েছে।
চিকিৎসা ক্ষেত্রে AI-এর একটি গুরুত্বপূর্ণ ব্যবহার হচ্ছে মেডিকেল ইমেজ বিশ্লেষণ। এক্স-রে, CT-এক্সরে বা অন্যান্য মেডিকেল ইমেজ বিশ্লেষণে AI চিকিৎসকদের সম্ভাব্য রোগ বা অস্বাভাবিকতা শনাক্ত করতে সহায়তা করতে পারে। যুক্তরাষ্ট্রের FDA-এর তথ্যেও ২০২৬ সালে AI-ভিত্তিক বিভিন্ন মেডিকেল ডিভাইসের অনুমোদনের উদাহরণ দেখা যাচ্ছে, যার মধ্যে রেডিওলজি, কার্ডিওভাসকুলার এবং আল্ট্রাসাউন্ড-সংক্রান্ত প্রযুক্তি রয়েছে। টেলিমেডিসিনও ডিজিটাল স্বাস্থ্যসেবার গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠছে। বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের স্বল্পতা রয়েছে এমন অঞ্চল বা প্রত্যন্ত এলাকার রোগীদের কাছে দূরবর্তীভাবে চিকিৎসা পরামর্শ ও কিছু স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দিতে ডিজিটাল প্রযুক্তি কার্যকর হতে পারে। ২০২৬ সালের বিশ্ব স্বাস্থ্য সম্মেলনে WHO তেলিরেডিওলজিকে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসাসেবা দূরবর্তী এলাকায় পৌঁছে দেওয়ার একটি কার্যকর পদ্ধতি হিসেবে গুরুত্ব দিয়েছে।
দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়াতেও স্বাস্থ্যসেবায় AI ও ডিজিটাল প্রযুক্তি ব্যবহারের উদ্যোগ বাড়ছে। জুন ২০২৬ এ WHO South-East Asia Region এবং The George Institute for Global Health, India প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা ও অসংক্রামক রোগ ব্যবস্থাপনায় AI ও ডিজিটাল স্বাস্থ্য প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়াতে সহযোগিতার উদ্যোগ নেয়। এর লক্ষ্য ছিল বাস্তব স্বাস্থ্যব্যবস্থায় প্রযুক্তির কার্যকারিতা, ব্যয়-সাশ্রয়িতা ও সবার জন্য সমান সুবিধা নিশ্চিত করা। তবে প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ার সঙ্গে নিরাপত্তা ও নিয়ন্ত্রণের বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। WHO জানিয়েছে, AI ব্যবহারের ক্ষেত্রে তথ্যের পক্ষপাত, সাইবার নিরাপত্তা, রোগীর তথ্যের গোপনীয়তা এবং ভুল সিদ্ধান্তের ঝুঁকি বিবেচনায় রাখা প্রয়োজন। সংস্থাটির মতে, প্রযুক্তির ব্যবহার যত দ্রুত বাড়ছে, তার সঙ্গে তাল মিলিয়ে AI governance বা দায়িত্বশীল ব্যবহারের কাঠামো তৈরি করা জরুরি।
এদিকে যুক্তরাষ্ট্রের FDA ১৮ আগস্ট ২০২৬ এ Generative AI-সমৃদ্ধ মেডিকেল ডিভাইসের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে একটি নতুন আলোচনা পত্র প্রকাশ করেছে। সেখানে এ ধরনের প্রযুক্তির ঝুঁকি মূল্যায়ন, বাজারে আসার আগে পরীক্ষা এবং বাজারে ব্যবহারের পর নজরদারির বিষয়গুলো নিয়ে মতামত চাওয়া হয়েছে। বিশেষজ্ঞদের কাছে তাই স্বাস্থ্যসেবার ভবিষ্যৎ শুধু নতুন প্রযুক্তি আবিষ্কারের ওপর নির্ভর করছে না; প্রযুক্তিকে কতটা নিরাপদ, কার্যকর ও দায়িত্বশীলভাবে ব্যবহার করা যায়, সেটিও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
AI, টেলিমেডিসিন, ডিজিটাল স্বাস্থ্য রেকর্ড ও স্মার্ট মেডিকেল ডিভাইসের ব্যবহার আরও বাড়লে চিকিৎসাসেবা দ্রুততর ও তথ্যনির্ভর হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। তবে প্রযুক্তি চিকিৎসকের বিকল্প নয়—বরং সঠিক ব্যবহারের মাধ্যমে চিকিৎসকদের সক্ষমতা বাড়ানো এবং রোগীর কাছে উন্নত স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দেওয়াই হতে পারে আধুনিক স্বাস্থ্য প্রযুক্তির মূল লক্ষ্য।
