ডিজিটাল সেবার বিস্তারের সঙ্গে সঙ্গে অনলাইনে একজন মানুষের পরিচয় নিরাপদভাবে যাচাই করা এখন প্রযুক্তি বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে উঠেছে। ব্যাংকিং, সরকারি সেবা, স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা, অনলাইন ব্যবসা থেকে শুরু করে বিভিন্ন ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে পরিচয় নিশ্চিত করার প্রয়োজন বাড়ছে। আর এই পরিবর্তনের কেন্দ্রেই উঠে আসছে Digital Identity বা ডিজিটাল পরিচয়। বিশ্বব্যাংকের ২০২৬ সালের তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বে প্রায় ২.৯ বিলিয়ন মানুষ এখনও অনলাইন লেনদেনের জন্য প্রয়োজনীয় ডিজিটাল পরিচয় থেকে বঞ্চিত। বিশেষ করে সাব-সাহারান আফ্রিকা ও দক্ষিণ এশিয়ায় এই ঘাটতি বেশি। একই সঙ্গে বিশ্বব্যাংক ডিজিটাল আইডি, ডিজিটাল পেমেন্ট এবং নিরাপদ ডেটা বিনিময়কে আধুনিক Digital Public Infrastructure-এর গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি হিসেবে দেখছে।

এই বাস্তবতায় বিভিন্ন দেশ নিরাপদ ও আন্তঃসংযুক্ত ডিজিটাল পরিচয় ব্যবস্থা গড়ে তুলতে কাজ করছে। সবচেয়ে বড় উদাহরণগুলোর একটি হলো ইউরোপীয় ইউনিয়নের European Digital Identity Wallet। ইউরোপীয় কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, প্রতিটি EU সদস্যরাষ্ট্রকে ২০২৬ সালের শেষ নাগাদ নাগরিক, বাসিন্দা ও ব্যবসার জন্য অন্তত একটি Digital Identity Wallet সরবরাহ করতে হবে। এই Wallet শুধু পরিচয় প্রমাণের জন্য নয়। ব্যবহারকারীরা এর মাধ্যমে ডিজিটাল ডকুমেন্ট সংরক্ষণ ও শেয়ার করতে, বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি সেবায় পরিচয় যাচাই করতে এবং আইনগতভাবে কার্যকর ইলেকট্রনিক স্বাক্ষর তৈরি করতে পারবেন। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, ব্যবহারকারী প্রয়োজনীয় তথ্যের নির্দিষ্ট অংশ শেয়ার করতে পারবেন অপ্রয়োজনীয় ব্যক্তিগত তথ্য প্রকাশ না করেই।

এর একটি বাস্তব উদাহরণ হতে পারে বয়স যাচাই। ইউরোপীয় কমিশন ২০২৬ সালের এপ্রিল মাসে এমন একটি Age Verification App চালুর উদ্যোগ নেয়, যার মাধ্যমে কোনো ওয়েবসাইটে ব্যবহারকারী নির্দিষ্ট বয়সসীমা পূরণ করেন কি না তা যাচাই করা যাবে, কিন্তু তার সঠিক বয়স বা অন্যান্য ব্যক্তিগত পরিচয় প্রকাশ করার প্রয়োজন হবে না। এই ব্যবস্থা Digital Identity Wallet-এর সঙ্গে যুক্ত করা সম্ভব। ডিজিটাল পরিচয় ব্যবস্থার এই পরিবর্তন শুধু ইউরোপেই সীমাবদ্ধ নয়। বিশ্বব্যাংকের Global Digital Public Infrastructure Program ইতোমধ্যে ৮০টির বেশি দেশকে নিরাপদ ও অন্তর্ভুক্তিমূলক Digital ID, ডিজিটাল পেমেন্ট এবং নিরাপদ ডেটা-শেয়ারিং অবকাঠামো তৈরিতে সহায়তা করছে। বিশ্বব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৫ সাল থেকে তাদের সহায়তায় ৮০টি দেশ নিরাপদ ও অন্তর্ভুক্তিমূলক ডিজিটাল পরিচয় ব্যবস্থা চালু করেছে।

তবে Digital Identity-এর বিস্তারের সঙ্গে নিরাপত্তা ও গোপনীয়তার প্রশ্নও আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। ব্যক্তিগত পরিচয় চুরি, সাইবার আক্রমণ, তথ্যের অপব্যবহার এবং একটি কেন্দ্রীয় ব্যবস্থার ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা বড় ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। বিশ্বব্যাংকও নিরাপদ Digital Public Infrastructure-এর ক্ষেত্রে শক্তিশালী আইন, তথ্য সুরক্ষা, সাইবার নিরাপত্তা এবং ব্যবহারকারীর আস্থাকে গুরুত্বপূর্ণ শর্ত হিসেবে উল্লেখ করেছে। এই কারণে নতুন প্রজন্মের Digital Identity ব্যবস্থায় শুধু “আপনি কে”—এই প্রশ্নের উত্তর দেওয়াই লক্ষ্য নয়; বরং “কোন তথ্য আপনি শেয়ার করবেন”—সেই নিয়ন্ত্রণও ব্যবহারকারীর হাতে রাখার চেষ্টা করা হচ্ছে। Digital Wallet ও Verifiable Credential-এর মতো প্রযুক্তি এই ধারণাকে আরও বাস্তব করে তুলছে। বিশ্বব্যাংকের ২০২৬ সালের একটি প্রতিবেদনে Digital Wallet-কে পরিচয়, তথ্য শেয়ারিং, ইলেকট্রনিক স্বাক্ষর এবং ডিজিটাল পেমেন্টকে একত্রিত করার নতুন কাঠামো হিসেবে বিশ্লেষণ করা হয়েছে।

বিশেষজ্ঞদের কাছে তাই Digital Identity এখন শুধু একটি প্রযুক্তিগত সুবিধা নয়; এটি ভবিষ্যতের ডিজিটাল অর্থনীতি ও সরকারি সেবার অবকাঠামোর গুরুত্বপূর্ণ অংশ। একজন নাগরিকের পরিচয় যদি নিরাপদভাবে ডিজিটালভাবে যাচাই করা যায়, তাহলে ব্যাংক অ্যাকাউন্ট খোলা, সরকারি সেবা গ্রহণ, শিক্ষা বা চাকরির যোগ্যতা যাচাই কিংবা অনলাইন লেনদেন অনেক প্রক্রিয়াই আরও দ্রুত ও সহজ করা সম্ভব। ২০২৬ সালকে এ ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ সময় হিসেবে দেখা হচ্ছে। ইউরোপে Digital Identity Wallet-এর পূর্ণাঙ্গ ব্যবস্থার দিকে এগিয়ে যাওয়া এবং বিশ্বের বিভিন্ন দেশে Digital ID-ভিত্তিক Digital Public Infrastructure-এর সম্প্রসারণ দেখাচ্ছে, অনলাইনে পরিচয়ের ধারণা ধীরে ধীরে পাসওয়ার্ড ও সাধারণ অ্যাকাউন্টের সীমা ছাড়িয়ে যাচ্ছে।

ভবিষ্যতের ডিজিটাল দুনিয়ায় হয়তো একটি স্মার্টফোনের Digital Identity Wallet ই হয়ে উঠবে একজন মানুষের পরিচয়, যোগ্যতা, অনুমোদন ও বিভিন্ন ডিজিটাল সেবায় প্রবেশের গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম। তবে সেই ভবিষ্যৎ সফল করতে প্রযুক্তির পাশাপাশি নিরাপত্তা, গোপনীয়তা, ব্যবহারকারীর নিয়ন্ত্রণ এবং সবার জন্য সমান সুযোগ নিশ্চিত করাই হবে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।