সঞ্চয়পত্র কী? কীভাবে কিনবেন ও কত মুনাফা পাওয়া যায়? - Daily Digantor

সঞ্চয়পত্র কী? কীভাবে কিনবেন ও কত মুনাফা পাওয়া যায়?

সঞ্চয়পত্র কী? কীভাবে কিনবেন ও কত মুনাফা পাওয়া যায়?
—সঞ্চয়পত্র কী? কীভাবে কিনবেন ও কত মুনাফা পাওয়া যায়?

নিরাপদ জায়গায় টাকা বিনিয়োগ করে নির্দিষ্ট হারে মুনাফা পেতে চান—এমন মানুষের কাছে বাংলাদেশ সরকারের সঞ্চয়পত্র একটি পরিচিত বিনিয়োগ মাধ্যম। এটি মূলত সরকারের কাছ থেকে কেনা এক ধরনের সঞ্চয়ভিত্তিক বিনিয়োগ পণ্য। নির্দিষ্ট মেয়াদ পর্যন্ত টাকা রাখার বিনিময়ে সরকার নির্ধারিত হারে মুনাফা দেয়।

সঞ্চয়পত্রের মুনাফার হার সাধারণত বাজার পরিস্থিতি অনুযায়ী সরকার পর্যালোচনা করে। ২০২৬ সালের জুলাই থেকে ডিসেম্বর সময়ের জন্য আগের হারই বহাল রাখা হয়েছে। বর্তমানে বিভিন্ন সঞ্চয়পত্রে সর্বোচ্চ মুনাফার হার ১১.৯৮ শতাংশ।

সঞ্চয়পত্র কী?

সঞ্চয়পত্র হলো সরকারের মাধ্যমে পরিচালিত একটি সঞ্চয় ও বিনিয়োগ ব্যবস্থা। সাধারণ মানুষ নির্দিষ্ট পরিমাণ টাকা বিনিয়োগ করে নির্ধারিত মেয়াদ শেষে মূল টাকার পাশাপাশি মুনাফা পেতে পারেন।

ব্যাংকের এফডিআরের সঙ্গে সঞ্চয়পত্রের কিছুটা মিল থাকলেও এটি ব্যাংকের আমানত নয়। এটি সরকারের জাতীয় সঞ্চয় ব্যবস্থার একটি অংশ এবং জাতীয় সঞ্চয় অধিদপ্তরের আওতায় বিভিন্ন স্কিম পরিচালিত হয়।

বাংলাদেশে কী কী সঞ্চয়পত্র রয়েছে?

বর্তমানে প্রচলিত প্রধান সঞ্চয়পত্রগুলোর মধ্যে রয়েছে—

  • ৫ বছর মেয়াদি বাংলাদেশ সঞ্চয়পত্র
  • ৩ মাস অন্তর মুনাফাভিত্তিক সঞ্চয়পত্র
  • পরিবার সঞ্চয়পত্র
  • পেনশনার সঞ্চয়পত্র

স্কিমভেদে কারা কিনতে পারবেন, কত টাকা বিনিয়োগ করা যাবে এবং কখন মুনাফা পাওয়া যাবে—এসব নিয়ম আলাদা।

বর্তমানে কত মুনাফা পাওয়া যায়?

২০২৬ সালের জুলাই–ডিসেম্বর সময়ের জন্য সঞ্চয়পত্রের বিদ্যমান মুনাফার হার অপরিবর্তিত রাখা হয়েছে। ৭ লাখ ৫০ হাজার টাকা পর্যন্ত বিনিয়োগের ক্ষেত্রে কয়েকটি প্রধান স্কিমে মেয়াদপূর্তিতে হার হলো—

সঞ্চয়পত্র মুনাফার হার
পেনশনার সঞ্চয়পত্র ১১.৯৮%
পরিবার সঞ্চয়পত্র ১১.৯৩%
৫ বছর মেয়াদি বাংলাদেশ সঞ্চয়পত্র ১১.৮৩%
৩ মাস অন্তর মুনাফাভিত্তিক সঞ্চয়পত্র ১১.৮২%

৭ লাখ ৫০ হাজার টাকার বেশি বিনিয়োগের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট স্কিমে মুনাফার হার কিছুটা কম। যেমন ৫ বছর মেয়াদি বাংলাদেশ সঞ্চয়পত্রে দ্বিতীয় স্তরের হার ১১.৮০ শতাংশ এবং ৩ মাস অন্তর মুনাফাভিত্তিক সঞ্চয়পত্রে ১১.৭৭ শতাংশ।

১ লাখ টাকা রাখলে কত মুনাফা?

উদাহরণ হিসেবে ৫ বছর মেয়াদি বাংলাদেশ সঞ্চয়পত্রে ১ লাখ টাকা বিনিয়োগের ক্ষেত্রে মেয়াদপূর্তির ঘোষিত হার ১১.৮৩ শতাংশ।

তবে এখানে একটি বিষয় মনে রাখা জরুরি—১১.৮৩ শতাংশ মানেই ১ লাখ টাকায় সরাসরি ১১ হাজার ৮৩০ টাকা হাতে পাওয়া নয়। সঞ্চয়পত্রের মুনাফা হিসাব, মেয়াদপূর্ব ভাঙানোর নিয়ম এবং প্রযোজ্য কর কর্তনের বিষয় রয়েছে। তাই প্রকৃত প্রাপ্য অর্থ হিসাব করতে সংশ্লিষ্ট স্কিমের সরকারি হিসাব পদ্ধতি অনুসরণ করতে হয়।

সঞ্চয়পত্র কীভাবে কিনবেন?

সঞ্চয়পত্র কেনার জন্য অনুমোদিত বিক্রয়কেন্দ্রে আবেদন করতে হয়। ব্যাংকগুলোও সঞ্চয়পত্রের অনুমোদিত বিক্রয়কারী প্রতিষ্ঠান হিসেবে কাজ করে।

২০২৬ সালের জুনে বাংলাদেশ ব্যাংক ব্যাংকগুলোকে সঞ্চয়পত্র বিক্রয় ও গ্রাহকসেবা নির্বিঘ্ন রাখার নির্দেশ দেয়। কেন্দ্রীয় ব্যাংক জানায়, Savings Certificate Rules, 1977 অনুযায়ী ব্যাংকগুলো অনুমোদিত ইস্যুকারী প্রতিষ্ঠান হিসেবে সঞ্চয়পত্র বিক্রয়ে সহায়তা করার দায়িত্ব পালন করে।

সাধারণভাবে প্রয়োজনীয় পরিচয়পত্র, ব্যাংক হিসাবের তথ্য এবং নির্ধারিত আবেদনপত্রসহ অনুমোদিত বিক্রয়কেন্দ্রে যোগাযোগ করতে হয়। তবে কোন স্কিমে কী কী কাগজ লাগবে, তা কেনার আগে সংশ্লিষ্ট ব্যাংক বা জাতীয় সঞ্চয় অধিদপ্তরের কাছ থেকে নিশ্চিত হওয়া উচিত।

টাকা রাখার পর সুদের হার কমে গেলে কী হবে?

সঞ্চয়পত্রের ক্ষেত্রে এটি গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়। সরকার ভবিষ্যতে নতুন সঞ্চয়পত্রের মুনাফার হার পরিবর্তন করলেও আগে কেনা সঞ্চয়পত্রে কেনার সময় প্রযোজ্য হারই মেয়াদ পর্যন্ত বহাল থাকে—সাম্প্রতিক সরকারি সিদ্ধান্ত সম্পর্কিত প্রতিবেদনে এ বিষয়টি নিশ্চিত করা হয়েছে।

অর্থাৎ আজ একটি নির্দিষ্ট হারে সঞ্চয়পত্র কিনলে পরে সরকার নতুন বিনিয়োগকারীদের জন্য হার কমিয়ে দিলেও আপনার বিদ্যমান বিনিয়োগের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নিয়ম অনুযায়ী আগের হার বহাল থাকবে।

মুনাফার ওপর কর দিতে হয় কি?

সঞ্চয়পত্রের মুনাফার ওপর উৎসে কর প্রযোজ্য হতে পারে। ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (NBR) স্পষ্ট করেছে যে সব সঞ্চয়পত্র মিলিয়ে মোট বিনিয়োগ ৫ লাখ টাকা পর্যন্ত হলে মুনাফার ওপর ৫ শতাংশ উৎসে কর প্রযোজ্য। পেনশনার সঞ্চয়পত্রের ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট শর্তে ৫ লাখ টাকা পর্যন্ত বিনিয়োগে উৎসে কর না কাটার বিষয়টিও NBR জানিয়েছে। মোট বিনিয়োগ ৫ লাখ টাকার বেশি হলে সাধারণ ক্ষেত্রে মুনাফার ওপর ১০ শতাংশ উৎসে কর প্রযোজ্য।

তাই সঞ্চয়পত্রের ঘোষিত মুনাফার হারকে সরাসরি হাতে পাওয়া নিট মুনাফা হিসেবে বিবেচনা করা ঠিক নয়।

সঞ্চয়পত্র কার জন্য বেশি উপযোগী?

যারা তুলনামূলক নিরাপদ বিনিয়োগ চান এবং নির্দিষ্ট সময়ের জন্য টাকা রেখে নিয়মিত বা মেয়াদ শেষে মুনাফা পেতে চান, তাদের কাছে সঞ্চয়পত্র আকর্ষণীয় হতে পারে।

তবে বিনিয়োগের আগে মেয়াদ, মুনাফার হার, বিনিয়োগসীমা, কর এবং মেয়াদপূর্তির আগে ভাঙালে কী পরিমাণ মুনাফা পাওয়া যাবে—এসব বিষয় যাচাই করা জরুরি।

শেষ কথা

সঞ্চয়পত্র মূলত সরকারের একটি সঞ্চয়ভিত্তিক বিনিয়োগ ব্যবস্থা, যেখানে নির্দিষ্ট মেয়াদে টাকা বিনিয়োগ করে সরকার ঘোষিত হারে মুনাফা পাওয়া যায়। ২০২৬ সালের জুলাই–ডিসেম্বর সময়ের জন্য এর মুনাফার হার অপরিবর্তিত রয়েছে। স্কিম ও বিনিয়োগের পরিমাণ অনুযায়ী বর্তমানে মুনাফার হার ১১.৭৭% থেকে ১১.৯৮%। তবে কর ও অন্যান্য নিয়মের কারণে ঘোষিত হার এবং বিনিয়োগকারীর হাতে পাওয়া নিট অর্থ এক নয়।