বাংলাদেশে ব্যাংক কীভাবে টাকা আয় করে? - Daily Digantor

বাংলাদেশে ব্যাংক কীভাবে টাকা আয় করে?

বাংলাদেশে ব্যাংক কীভাবে টাকা আয় করে?
—বাংলাদেশে ব্যাংক কীভাবে টাকা আয় করে?

ব্যাংকে আমরা টাকা জমা রাখি, আবার প্রয়োজন হলে সেই ব্যাংক থেকেই ঋণ নিই। কিন্তু প্রশ্ন হলো—গ্রাহকের আমানত, ঋণ ও বিভিন্ন সেবা পরিচালনা করে ব্যাংক আসলে কীভাবে আয় করে? সহজভাবে বললে, ব্যাংকের আয়ের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উৎস হলো ঋণ ও বিনিয়োগ থেকে পাওয়া সুদ বা মুনাফা। এর পাশাপাশি সরকারি সিকিউরিটিজ, বিভিন্ন ব্যাংকিং সেবা এবং কমিশন থেকেও আয় করে ব্যাংকগুলো।

ঋণ দিয়ে সুদ আয়

ব্যাংকের প্রচলিত ব্যবসার অন্যতম প্রধান অংশ হলো আমানত সংগ্রহ করে সেই অর্থের একটি অংশ ঋণ হিসেবে দেওয়া। গ্রাহককে দেওয়া ঋণ থেকে ব্যাংক সুদ আয় করে। অন্যদিকে আমানতকারীদের সঞ্চয়, এফডিআর বা অন্যান্য আমানতের বিপরীতে ব্যাংককে সুদ দিতে হয়।

ঋণ থেকে পাওয়া সুদ এবং আমানতের বিপরীতে দেওয়া সুদের পার্থক্যকে ব্যাংকের নেট ইন্টারেস্ট ইনকাম (NII) বলা হয়। অর্থাৎ ব্যাংকের মূল ব্যবসার একটি বড় অংশ দাঁড়িয়ে আছে—কত কম খরচে অর্থ সংগ্রহ করে কত বেশি আয়ে তা ঋণ বা বিনিয়োগে ব্যবহার করা যায় তার ওপর।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের জুনে দেশের ব্যাংকিং খাতে গড় ঋণের সুদের হার ছিল ১২.০৮ শতাংশ, যেখানে গড় আমানতের সুদের হার ছিল ৬.২৬ শতাংশ।

সরকারি বন্ড ও ট্রেজারি সিকিউরিটিজে বিনিয়োগ

ব্যাংকের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ আয়ের উৎস হলো সরকারি ট্রেজারি বিল ও বন্ডে বিনিয়োগ। ব্যাংকগুলো তাদের অর্থের একটি অংশ সরকারি সিকিউরিটিজে বিনিয়োগ করতে পারে এবং এর বিপরীতে সুদ বা রিটার্ন পায়।

সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতে এই আয়ের গুরুত্ব আরও বেড়েছে। ২০২৪ সালে অনেক ব্যাংকের মুনাফার বড় অংশ এসেছে সরকারি সিকিউরিটিজে বিনিয়োগ থেকে, যখন বেসরকারি খাতে ঋণের প্রবৃদ্ধি তুলনামূলকভাবে দুর্বল ছিল।

কিছু ব্যাংকের ক্ষেত্রে বন্ড থেকে পাওয়া আয় মোট আয়ের ৬০ থেকে ৮০ শতাংশ পর্যন্ত পৌঁছেছে বলেও সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।

ব্যাংকিং সেবার ফি ও কমিশন

ব্যাংক শুধু সুদ থেকেই আয় করে না। গ্রাহকদের বিভিন্ন সেবা দেওয়ার বিপরীতে ব্যাংক ফি ও কমিশনও আদায় করে, যেমন:

  • ক্রেডিট ও ডেবিট কার্ডের বিভিন্ন ফি
  • এলসি বা Letter of Credit কমিশন
  • ব্যাংক গ্যারান্টি
  • রেমিট্যান্স ও বৈদেশিক লেনদেনের সেবা
  • টাকা স্থানান্তর ও পেমেন্ট সেবা
  • এটিএম ও অন্যান্য নির্দিষ্ট ব্যাংকিং সেবা
  • বিভিন্ন ধরনের ডকুমেন্টেশন ও সার্ভিস চার্জ

এই আয়কে সাধারণভাবে নন-ইন্টারেস্ট ইনকাম বলা হয়।

বৈদেশিক মুদ্রা লেনদেন থেকেও আয়

আমদানি-রপ্তানি, রেমিট্যান্স এবং অন্যান্য বৈদেশিক লেনদেনে ব্যাংকের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। বৈদেশিক মুদ্রা কেনাবেচা ও সংশ্লিষ্ট সেবার মাধ্যমে ব্যাংক ফি, কমিশন বা বৈদেশিক মুদ্রার লেনদেন থেকে আয় করতে পারে।

বাংলাদেশের মতো আমদানি-রপ্তানি ও রেমিট্যান্সনির্ভর অর্থনীতিতে এই খাত ব্যাংকের ব্যবসার গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

বিনিয়োগ থেকে আয়

ব্যাংক বিভিন্ন অনুমোদিত খাতে বিনিয়োগ করেও আয় করে। এর মধ্যে সরকারি সিকিউরিটিজ ছাড়াও নির্দিষ্ট আর্থিক বিনিয়োগ থাকতে পারে।

সাম্প্রতিক সময়ে কিছু ব্যাংকের আয়ের ক্ষেত্রে বিনিয়োগ আয় বিশেষ ভূমিকা রেখেছে। উদাহরণ হিসেবে, রাষ্ট্রায়ত্ত সোনালী ব্যাংক ২০২৫ সালে সরকারি বন্ডসহ বিনিয়োগ থেকে ৯,৭৯৯ কোটি টাকা আয় করেছে, যা আগের বছরের তুলনায় ৫৫ শতাংশ বেশি। একই সময়ে ব্যাংকটির নেট ইন্টারেস্ট ইনকাম ৭৭ শতাংশ কমে ৩৩৭ কোটি টাকায় নেমেছিল।

ইসলামী ব্যাংক কীভাবে আয় করে?

বাংলাদেশে প্রচলিত সুদভিত্তিক ব্যাংকের পাশাপাশি ইসলামী শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংকও রয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, দেশে ১০টি ইসলামী শরিয়াহভিত্তিক প্রাইভেট কমার্শিয়াল ব্যাংক রয়েছে। এসব ব্যাংক প্রচলিত সুদের পরিবর্তে শরিয়াহসম্মত বিনিয়োগ ও মুনাফা-ভাগাভাগির নীতিতে পরিচালিত হয়।

অর্থাৎ ব্যাংকের ধরন অনুযায়ী আয়ের পদ্ধতিতে পার্থক্য থাকলেও মূল লক্ষ্য হলো আমানত ও অন্যান্য অর্থনৈতিক সম্পদকে বিভিন্ন অনুমোদিত খাতে ব্যবহার করে আয় তৈরি করা।

সব আয়ই কিন্তু ব্যাংকের লাভ নয়

একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, ব্যাংকের মোট আয় এবং নিট লাভ এক জিনিস নয়। ব্যাংককে আমানতকারীদের সুদ দিতে হয়, কর্মীদের বেতন দিতে হয়, শাখা ও প্রযুক্তি অবকাঠামোর খরচ বহন করতে হয় এবং খেলাপি ঋণের বিপরীতে প্রয়োজনীয় প্রভিশন রাখতে হয়।

ফলে ব্যাংক অনেক টাকা আয় করলেও সেই পুরো অর্থ লাভ হিসেবে বিবেচিত হয় না। সব ধরনের ব্যয় ও প্রয়োজনীয় সমন্বয় বাদ দেওয়ার পর যে অর্থ থাকে সেটিই মূলত ব্যাংকের নিট মুনাফার অংশ।

সহজ হিসাব করলে

ধরা যাক, একটি ব্যাংক গ্রাহকদের কাছ থেকে আমানত সংগ্রহ করল। সেই অর্থের একটি অংশ আমানতকারীদের সুদ দেওয়ার জন্য ব্যয় হবে। বাকি অর্থ ঋণ বা বিভিন্ন বিনিয়োগে ব্যবহার করে ব্যাংক আয় করবে।

অর্থ সংগ্রহ → ঋণ ও বিনিয়োগ → সুদ/মুনাফা ও ফি আয় → পরিচালন ব্যয় ও অন্যান্য খরচ বাদ → নিট লাভ

তবে বাস্তবে ব্যাংকের হিসাব আরও জটিল। ঋণের ঝুঁকি, খেলাপি ঋণ, প্রভিশন, তারল্য, সুদের হার এবং বাজার পরিস্থিতি—সবকিছুই ব্যাংকের চূড়ান্ত লাভকে প্রভাবিত করে।

মূল কথা

বাংলাদেশে ব্যাংকের টাকা আয়ের প্রধান পথ হলো ঋণ থেকে সুদ বা মুনাফা, সরকারি সিকিউরিটিজে বিনিয়োগ, বিভিন্ন ব্যাংকিং সেবার ফি ও কমিশন এবং বৈদেশিক মুদ্রা ও অন্যান্য অনুমোদিত বিনিয়োগ কার্যক্রম। সাম্প্রতিক সময়ে সরকারি সিকিউরিটিজ থেকে আয়ও অনেক ব্যাংকের মুনাফায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।

তাই ব্যাংককে শুধু ‘মানুষের টাকা নিয়ে অন্যকে ঋণ দেয়’—এভাবে দেখলে পুরো চিত্রটি বোঝা যায় না। আধুনিক ব্যাংকিং ব্যবস্থায় আমানত, ঋণ, বিনিয়োগ ও বিভিন্ন আর্থিক সেবাকে কেন্দ্র করে একাধিক উৎস থেকে আয় তৈরি হয়।