দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ কেন হয়েছিল? যুদ্ধ শুরুর প্রধান কারণগুলো - Daily Digantor

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ কেন হয়েছিল? যুদ্ধ শুরুর প্রধান কারণগুলো

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ কেন হয়েছিল? যুদ্ধ শুরুর প্রধান কারণগুলো
—দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ কেন হয়েছিল? যুদ্ধ শুরুর প্রধান কারণগুলো

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ ছিল ইতিহাসের সবচেয়ে ভয়াবহ সামরিক সংঘাতগুলোর একটি। যুদ্ধটি ১৯৩৯ সালের ১ সেপ্টেম্বর জার্মানির পোল্যান্ড আক্রমণের মাধ্যমে শুরু হয় এবং ১৯৪৫ সালের ২ সেপ্টেম্বর জাপানের আত্মসমর্পণের মাধ্যমে শেষ হয়।

তবে যুদ্ধের পেছনে শুধু পোল্যান্ড আক্রমণই কারণ ছিল না। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পরের রাজনৈতিক পরিস্থিতি, জার্মানির ওপর কঠোর শর্ত, অর্থনৈতিক সংকট, নাৎসিবাদের উত্থান, সাম্রাজ্য বিস্তার এবং দুর্বল আন্তর্জাতিক প্রতিরোধ—সব মিলেই দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরিস্থিতি তৈরি হয়।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের প্রধান কারণ

১. ভার্সাই চুক্তির কঠোর শর্ত

প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর ১৯১৯ সালের ভার্সাই চুক্তি জার্মানির ওপর কঠোর শর্ত আরোপ করে। জার্মানিকে ক্ষতিপূরণ দিতে হয়, সামরিক শক্তির ওপর সীমাবদ্ধতা আরোপ করা হয় এবং কিছু ভূখণ্ড হারাতে হয়।

জার্মানির একটি বড় অংশের মানুষের মধ্যে এই চুক্তির বিরুদ্ধে ক্ষোভ তৈরি হয়। অ্যাডলফ হিটলার সেই ক্ষোভকে রাজনৈতিকভাবে কাজে লাগান।

২. হিটলার ও নাৎসি দলের উত্থান

জার্মানিতে অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক অস্থিরতার সুযোগ নিয়ে অ্যাডলফ হিটলার ও নাৎসি পার্টি ক্ষমতায় আসে।

হিটলার জার্মানির সামরিক শক্তি পুনর্গঠন, ভার্সাই চুক্তির শর্ত বাতিল এবং জার্মানির জন্য আরও ভূখণ্ড অর্জনের নীতি গ্রহণ করেন। তার আগ্রাসী পররাষ্ট্রনীতি ইউরোপে যুদ্ধের আশঙ্কা বাড়িয়ে দেয়।

৩. অর্থনৈতিক মহামন্দা

১৯২৯ সালের মহামন্দা (Great Depression) বিশ্বের অর্থনীতিতে ব্যাপক সংকট তৈরি করে। বেকারত্ব, দারিদ্র্য ও সামাজিক অস্থিরতা অনেক দেশে রাজনৈতিক চরমপন্থার উত্থানকে উৎসাহিত করে।

জার্মানিতেও অর্থনৈতিক দুরবস্থা নাৎসি দলের জনপ্রিয়তা বাড়াতে ভূমিকা রাখে।

৪. জার্মানির সামরিক শক্তি বৃদ্ধি

ক্ষমতায় আসার পর হিটলার জার্মানির সামরিক শক্তি দ্রুত বাড়াতে শুরু করেন। ভার্সাই চুক্তির সীমাবদ্ধতা উপেক্ষা করে সেনাবাহিনী, বিমানবাহিনী ও অস্ত্রশক্তি সম্প্রসারণ করা হয়।

এর ফলে ইউরোপের শক্তির ভারসাম্য নষ্ট হতে থাকে।

৫. জার্মানির ভূখণ্ড সম্প্রসারণ

হিটলার জার্মানির জন্য নতুন ভূখণ্ড অর্জনের চেষ্টা করেন। ১৯৩৮ সালে অস্ট্রিয়া জার্মানির সঙ্গে যুক্ত হয় এবং একই বছর মিউনিখ চুক্তির পর চেকোস্লোভাকিয়ার সুদেতেনল্যান্ড জার্মানির নিয়ন্ত্রণে যায়।

এরপর ১৯৩৯ সালে জার্মানি চেকোস্লোভাকিয়ার বাকি অংশের বড় অংশ দখল করে। ইউরোপের অন্যান্য শক্তি জার্মানিকে শুরুতে কঠোরভাবে প্রতিহত না করায় হিটলারের আগ্রাসী নীতি আরও উৎসাহিত হয়।

৬. ব্রিটেন ও ফ্রান্সের তুষ্টিকরণ নীতি

যুদ্ধ এড়ানোর উদ্দেশ্যে ব্রিটেন ও ফ্রান্স কিছু সময় হিটলারের কিছু দাবি মেনে নেওয়ার নীতি অনুসরণ করে। ইতিহাসে এই নীতিকে Appeasement বা তুষ্টিকরণ নীতি বলা হয়।

কিন্তু এতে হিটলার আরও আগ্রাসী হয়ে ওঠেন বলে অনেক ইতিহাসবিদ মনে করেন।

৭. জাপান ও ইতালির সাম্রাজ্যবাদী নীতি

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুধু ইউরোপের ঘটনাকে কেন্দ্র করে হয়নি। এশিয়ায় জাপান এবং আফ্রিকায় ইতালি সাম্রাজ্য বিস্তারের চেষ্টা চালায়।

জাপান চীন ও পূর্ব এশিয়ায় নিজের নিয়ন্ত্রণ বাড়াতে থাকে। অন্যদিকে ইতালি ১৯৩৫ সালে ইথিওপিয়া আক্রমণ করে।

জার্মানি, ইতালি ও জাপানের মধ্যে পরবর্তীতে ঘনিষ্ঠ সামরিক ও রাজনৈতিক সম্পর্ক গড়ে ওঠে।

তাৎক্ষণিক কারণ: পোল্যান্ড আক্রমণ

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরুর সরাসরি কারণ ছিল জার্মানির পোল্যান্ড আক্রমণ।

১৯৩৯ সালের ১ সেপ্টেম্বর জার্মানি পোল্যান্ড আক্রমণ করে। এর প্রতিক্রিয়ায় ৩ সেপ্টেম্বর ব্রিটেন ও ফ্রান্স জার্মানির বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করে।

এরপর ইউরোপের সংঘাত দ্রুত বড় আকার ধারণ করে এবং পরবর্তী সময়ে বিশ্বের বিভিন্ন দেশ এতে যুক্ত হয়।

যুদ্ধের ফল কী হয়েছিল?

১৯৪৫ সালে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষ হওয়ার সময় বিশ্বের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ব্যবস্থায় বড় পরিবর্তন আসে। কোটি কোটি মানুষ নিহত ও বাস্তুচ্যুত হয় এবং ইউরোপ ও এশিয়ার বহু অঞ্চল ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়।

যুদ্ধের পর জাতিসংঘ প্রতিষ্ঠিত হয়, যুক্তরাষ্ট্র ও সোভিয়েত ইউনিয়ন বিশ্বের প্রধান পরাশক্তি হিসেবে উঠে আসে এবং পরবর্তীতে শুরু হয় স্নায়ুযুদ্ধ।