WHO বা World Health Organization (বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা) হলো জাতিসংঘের একটি বিশেষায়িত সংস্থা, যা বিশ্বজুড়ে জনস্বাস্থ্য উন্নয়ন, রোগ প্রতিরোধ এবং স্বাস্থ্যঝুঁকি মোকাবিলায় কাজ করে। আন্তর্জাতিক পর্যায়ে স্বাস্থ্যসংক্রান্ত নীতি ও নির্দেশনা তৈরি, রোগের বিস্তার পর্যবেক্ষণ এবং বিভিন্ন দেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থাকে সহায়তা করা WHO-এর গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব।
WHO কী?
WHO-এর পূর্ণরূপ World Health Organization। সংস্থাটি ৭ এপ্রিল ১৯৪৮ সালে আনুষ্ঠানিকভাবে কার্যক্রম শুরু করে। প্রতি বছর এই দিনটি বিশ্ব স্বাস্থ্য দিবস হিসেবে পালিত হয়।
WHO-এর সদর দপ্তর সুইজারল্যান্ডের জেনেভায় অবস্থিত। বিশ্বের বিভিন্ন দেশের সঙ্গে সমন্বয় করে স্বাস্থ্যসংক্রান্ত বিভিন্ন কর্মসূচি পরিচালনা করে সংস্থাটি।
WHO-এর মূল লক্ষ্য হলো বিশ্বের মানুষের সর্বোচ্চ সম্ভাব্য স্বাস্থ্যমান অর্জনে সহায়তা করা।
WHO-এর প্রধান কাজ কী?
WHO-এর কাজ শুধু রোগের চিকিৎসার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। বরং রোগ প্রতিরোধ, স্বাস্থ্যনীতি, জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলা এবং স্বাস্থ্যব্যবস্থার উন্নয়ন—সব ক্ষেত্রেই সংস্থাটি কাজ করে।
১. সংক্রামক রোগ নিয়ন্ত্রণ
করোনাভাইরাস, ইনফ্লুয়েঞ্জা, যক্ষ্মা, ম্যালেরিয়া, ডেঙ্গু, পোলিওসহ বিভিন্ন সংক্রামক রোগের বিস্তার পর্যবেক্ষণ ও নিয়ন্ত্রণে WHO দেশগুলোর সঙ্গে কাজ করে।
রোগের তথ্য সংগ্রহ, ঝুঁকি মূল্যায়ন এবং প্রয়োজনীয় জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থা গ্রহণের বিষয়ে সংস্থাটি নির্দেশনা ও কারিগরি সহায়তা দেয়।
২. মহামারি ও জরুরি স্বাস্থ্য পরিস্থিতি মোকাবিলা
কোনো দেশে বড় ধরনের রোগের প্রাদুর্ভাব, মহামারি, প্রাকৃতিক দুর্যোগ বা অন্যান্য স্বাস্থ্য জরুরি পরিস্থিতি তৈরি হলে WHO সংশ্লিষ্ট দেশকে সহায়তা করতে পারে।
জরুরি পরিস্থিতিতে রোগ শনাক্তকরণ, নজরদারি, স্বাস্থ্যকর্মীদের সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং প্রয়োজনীয় জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থা গ্রহণে WHO সমন্বয় করে।
৩. টিকাদান কর্মসূচিতে সহায়তা
বিশ্বজুড়ে টিকাদান কার্যক্রম সম্প্রসারণেও WHO গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। শিশুদের বিভিন্ন সংক্রামক রোগ থেকে সুরক্ষা দিতে টিকা কর্মসূচির নীতি, মানদণ্ড ও কারিগরি নির্দেশনা তৈরিতে সংস্থাটি কাজ করে।
পোলিও নির্মূল এবং অন্যান্য টিকাদান কর্মসূচির ক্ষেত্রেও WHO দীর্ঘদিন ধরে আন্তর্জাতিক অংশীদারদের সঙ্গে কাজ করছে।
৪. স্বাস্থ্যবিষয়ক আন্তর্জাতিক নির্দেশনা
WHO বিভিন্ন রোগ, চিকিৎসা, জনস্বাস্থ্য এবং স্বাস্থ্যব্যবস্থাপনা নিয়ে বৈজ্ঞানিক তথ্য ও নির্দেশনা প্রকাশ করে।
এসব নির্দেশনা বিভিন্ন দেশের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়, চিকিৎসক, স্বাস্থ্যকর্মী ও অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের জন্য গুরুত্বপূর্ণ রেফারেন্স হিসেবে ব্যবহৃত হয়।
৫. মাতৃ ও শিশুর স্বাস্থ্য
গর্ভাবস্থা, প্রসবকালীন সেবা, নবজাতকের যত্ন এবং শিশুস্বাস্থ্যের উন্নয়নে WHO বিভিন্ন কর্মসূচি ও নীতিগত সহায়তা দিয়ে থাকে।
বিশেষ করে মাতৃমৃত্যু ও শিশুমৃত্যু কমানো এবং প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্যসেবা মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়ার ওপর গুরুত্ব দেয় সংস্থাটি।
৬. অপুষ্টি মোকাবিলা
অপুষ্টি, শিশুদের পুষ্টি, খাদ্যনিরাপত্তা এবং স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস নিয়েও WHO কাজ করে। স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন ও সুষম খাদ্য সম্পর্কে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বিভিন্ন সুপারিশ ও নির্দেশনা প্রকাশ করে সংস্থাটি।
৭. অসংক্রামক রোগ প্রতিরোধ
হৃদরোগ, ক্যানসার, ডায়াবেটিস ও দীর্ঘমেয়াদি শ্বাসতন্ত্রের রোগের মতো অসংক্রামক রোগ বর্তমানে বিশ্বজুড়ে বড় স্বাস্থ্যঝুঁকি।
ধূমপান, অস্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস, শারীরিক নিষ্ক্রিয়তা ও অতিরিক্ত অ্যালকোহল গ্রহণের মতো ঝুঁকি কমানোর বিষয়ে WHO বিভিন্ন নীতি ও কর্মসূচিকে উৎসাহিত করে।
৮. স্বাস্থ্যব্যবস্থার উন্নয়ন
উন্নয়নশীল দেশগুলোতে স্বাস্থ্যব্যবস্থা শক্তিশালী করা, স্বাস্থ্যকর্মীদের সক্ষমতা বৃদ্ধি, স্বাস্থ্যতথ্য ব্যবস্থার উন্নয়ন এবং প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্যসেবা মানুষের কাছে পৌঁছে দিতে WHO কারিগরি সহায়তা প্রদান করে।
WHO কীভাবে কাজ করে?
WHO একা সব স্বাস্থ্য কার্যক্রম পরিচালনা করে না। সদস্য দেশগুলোর সরকার, জাতিসংঘের অন্যান্য সংস্থা, গবেষণা প্রতিষ্ঠান, আন্তর্জাতিক সংস্থা ও বিভিন্ন অংশীদারের সঙ্গে সমন্বয় করে কাজ করে।
কোনো স্বাস্থ্যঝুঁকি দেখা দিলে WHO বৈজ্ঞানিক তথ্য বিশ্লেষণ করে এবং পরিস্থিতি অনুযায়ী দেশগুলোকে পরামর্শ ও কারিগরি সহায়তা দেয়।
WHO-এর গুরুত্ব কেন?
বর্তমান বিশ্বে একটি দেশের রোগ বা স্বাস্থ্যঝুঁকি দ্রুত অন্য দেশেও ছড়িয়ে পড়তে পারে। আন্তর্জাতিক ভ্রমণ, বাণিজ্য ও মানুষের চলাচলের কারণে সংক্রামক রোগ নিয়ন্ত্রণে দেশগুলোর মধ্যে সমন্বয় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
এই জায়গায় WHO বিশ্বব্যাপী স্বাস্থ্যঝুঁকি মোকাবিলা, তথ্য বিনিময়, বৈজ্ঞানিক নির্দেশনা এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতার একটি গুরুত্বপূর্ণ প্ল্যাটফর্ম হিসেবে কাজ করে।
বাংলাদেশে WHO-এর ভূমিকা
বাংলাদেশেও WHO সরকারের সঙ্গে বিভিন্ন জনস্বাস্থ্য কার্যক্রমে সহযোগিতা করে। সংক্রামক রোগ নিয়ন্ত্রণ, টিকাদান, স্বাস্থ্যব্যবস্থা শক্তিশালীকরণ, মাতৃ ও শিশুর স্বাস্থ্য, পুষ্টি এবং জরুরি স্বাস্থ্য পরিস্থিতি মোকাবিলাসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে WHO-এর কারিগরি সহায়তা রয়েছে।