১৯৪৯ সালে প্রতিষ্ঠিত NATO দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরবর্তী আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে।

NATO কী?

NATO-এর পূর্ণরূপ North Atlantic Treaty Organization । ১৯৪৯ সালের ৪ এপ্রিল উত্তর আটলান্টিক চুক্তি বা North Atlantic Treaty স্বাক্ষরের মাধ্যমে এই জোট প্রতিষ্ঠিত হয়।

প্রতিষ্ঠার সময় NATO-এর সদস্য ছিল ১২টি দেশ। এগুলো হলো—যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, কানাডা, ফ্রান্স, বেলজিয়াম, নেদারল্যান্ডস, লুক্সেমবার্গ, ইতালি, ডেনমার্ক, নরওয়ে, আইসল্যান্ড ও পর্তুগাল।

বর্তমানে NATO-এর সদস্য সংখ্যা ৩২টি দেশ ।

এর রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক সদর দপ্তর বেলজিয়ামের ব্রাসেলসে অবস্থিত।

NATO কেন তৈরি হয়েছিল?

NATO প্রতিষ্ঠার পেছনে সবচেয়ে বড় কারণ ছিল দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ইউরোপের নিরাপত্তা পরিস্থিতি এবং সোভিয়েত ইউনিয়নের প্রভাব বৃদ্ধি ।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষ হওয়ার পর ইউরোপের অনেক দেশ অর্থনৈতিক ও সামরিকভাবে দুর্বল হয়ে পড়ে। একই সময়ে সোভিয়েত ইউনিয়নের প্রভাব পূর্ব ইউরোপে দ্রুত বাড়তে থাকে।

পশ্চিম ইউরোপের দেশগুলো মনে করেছিল, ভবিষ্যতে কোনো সামরিক আগ্রাসন হলে এককভাবে তা মোকাবিলা করা কঠিন হবে। তাই যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডাসহ কয়েকটি ইউরোপীয় দেশ পারস্পরিক প্রতিরক্ষা সহযোগিতার ভিত্তিতে একটি সামরিক জোট গড়ে তোলে।

এই প্রেক্ষাপটেই ১৯৪৯ সালে NATO প্রতিষ্ঠিত হয়।

NATO-এর মূল উদ্দেশ্য কী?

NATO-এর প্রতিষ্ঠাকালীন চুক্তির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো সদস্য দেশগুলোর সম্মিলিত প্রতিরক্ষা ।

এর অর্থ হলো, কোনো সদস্য দেশের ওপর গুরুতর সশস্ত্র হামলা হলে সেটিকে শুধু ওই দেশের ওপর হামলা হিসেবে দেখা হবে না; বরং পুরো জোটের নিরাপত্তার জন্য হুমকি হিসেবে বিবেচনা করা হতে পারে।

এই নীতিই NATO-এর সবচেয়ে পরিচিত Article 5 -এর সঙ্গে সম্পর্কিত।

NATO-এর Article 5 কী?

NATO-এর Article 5 হলো জোটটির collective defence বা সম্মিলিত প্রতিরক্ষা নীতি ।

এর মূল ধারণা হলো—একজন সদস্যের ওপর সশস্ত্র হামলা হলে তা সব সদস্যের ওপর হামলা হিসেবে বিবেচিত হবে।

তবে এর অর্থ এই নয় যে প্রতিটি সদস্য একই ধরনের সামরিক পদক্ষেপ নিতেই বাধ্য। চুক্তি অনুযায়ী প্রত্যেক সদস্য দেশ প্রয়োজনীয় মনে করা পদক্ষেপ নিতে পারে, যার মধ্যে সামরিক শক্তি ব্যবহারের বিষয়ও থাকতে পারে।

NATO-এর ইতিহাসে Article 5 একবার—২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বর যুক্তরাষ্ট্রে সন্ত্রাসী হামলার পর—আনুষ্ঠানিকভাবে প্রয়োগ করা হয়েছিল।

NATO কী কী কাজ করে?

NATO-এর কার্যক্রম শুধু যুদ্ধ বা সামরিক অভিযান পরিচালনার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। সদস্য দেশগুলোর নিরাপত্তা ও প্রতিরক্ষা সক্ষমতা বাড়াতে এটি বিভিন্নভাবে কাজ করে।

১. সম্মিলিত প্রতিরক্ষা

সদস্য দেশগুলোর নিরাপত্তা রক্ষায় সামরিক সহযোগিতা ও প্রতিরক্ষা পরিকল্পনা NATO-এর অন্যতম প্রধান কাজ।

২. সামরিক সহযোগিতা

সদস্য দেশগুলোর সেনাবাহিনীর মধ্যে সমন্বয় বাড়ানো, যৌথ মহড়া পরিচালনা এবং সামরিক সক্ষমতা উন্নয়নে NATO কাজ করে।

৩. নিরাপত্তা ঝুঁকি মোকাবিলা

সন্ত্রাসবাদ, সাইবার হামলা, সামুদ্রিক নিরাপত্তা এবং অন্যান্য উদীয়মান নিরাপত্তা ঝুঁকি মোকাবিলায় NATO সদস্য দেশগুলোর মধ্যে সহযোগিতা করে।

৪. সংকট ব্যবস্থাপনা

আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা সংকট মোকাবিলায় NATO বিভিন্ন সময়ে সামরিক ও রাজনৈতিক উদ্যোগে অংশ নিয়েছে। পরিস্থিতি অনুযায়ী জোটটি সদস্য ও অংশীদার দেশগুলোর সঙ্গে সমন্বয় করে।

NATO কি শুধু ইউরোপের দেশগুলোর জোট?

না। NATO-তে ইউরোপের পাশাপাশি উত্তর আমেরিকার যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডাও সদস্য।

বর্তমানে জোটটির সদস্য ৩২টি। এর মধ্যে ইউরোপের অধিকাংশ NATO সদস্যের পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডা রয়েছে।

NATO-এর সদর দপ্তর কোথায়?

NATO-এর সদর দপ্তর ব্রাসেলস, বেলজিয়ামে অবস্থিত। এখান থেকেই জোটের রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক কার্যক্রম পরিচালিত হয়।

NATO ও জাতিসংঘ কি একই?

না। NATO এবং জাতিসংঘ সম্পূর্ণ আলাদা আন্তর্জাতিক সংস্থা।

জাতিসংঘ একটি বৈশ্বিক সংগঠন, যার সদস্য বিশ্বের অধিকাংশ দেশ এবং যার কাজের ক্ষেত্র শান্তি, নিরাপত্তা, মানবাধিকার, উন্নয়নসহ অনেক বিস্তৃত।

অন্যদিকে NATO একটি আঞ্চলিক রাজনৈতিক ও সামরিক জোট, যার মূল লক্ষ্য সদস্য দেশগুলোর নিরাপত্তা ও সম্মিলিত প্রতিরক্ষা নিশ্চিত করা।

বর্তমান বিশ্বে NATO-এর গুরুত্ব

স্নায়ুযুদ্ধের সময় NATO-এর প্রধান নিরাপত্তা প্রতিদ্বন্দ্বিতা ছিল সোভিয়েত ইউনিয়ন ও তার নেতৃত্বাধীন ওয়ারশ প্যাক্টের সঙ্গে। ১৯৯১ সালে সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা পরিস্থিতি পরিবর্তিত হলেও NATO বিলুপ্ত হয়নি।

পরবর্তীতে জোটটি নতুন নিরাপত্তা ঝুঁকি, সন্ত্রাসবাদ, সাইবার নিরাপত্তা এবং ইউরোপীয় নিরাপত্তাসহ বিভিন্ন বিষয়ে তার ভূমিকা সম্প্রসারণ করে।

বিশেষ করে ইউরোপের নিরাপত্তা পরিস্থিতি, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ এবং পূর্ব ইউরোপে প্রতিরক্ষা সহযোগিতার কারণে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে NATO আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে আবারও ব্যাপকভাবে আলোচিত হয়েছে।