UNESCO কী?
UNESCO-এর পূর্ণরূপ United Nations Educational, Scientific and Cultural Organization । দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর বিশ্বে শান্তি প্রতিষ্ঠা ও মানুষের মধ্যে পারস্পরিক বোঝাপড়া বাড়ানোর উদ্দেশ্যে সংস্থাটি প্রতিষ্ঠিত হয়।
UNESCO মনে করে, শুধু রাজনৈতিক বা অর্থনৈতিক চুক্তির মাধ্যমে দীর্ঘমেয়াদি শান্তি প্রতিষ্ঠা সম্ভব নয়। শিক্ষা, সংস্কৃতি, বিজ্ঞান ও তথ্যের ক্ষেত্রে মানুষের মধ্যে সহযোগিতা ও পারস্পরিক বোঝাপড়া তৈরি করাও গুরুত্বপূর্ণ।
UNESCO-এর প্রধান কাজ কী?
UNESCO-এর কার্যক্রম মূলত শিক্ষা, বিজ্ঞান, সংস্কৃতি এবং তথ্য ও যোগাযোগ —এই কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রকে ঘিরে পরিচালিত হয়।
১. শিক্ষার উন্নয়ন
বিশ্বের সব মানুষের জন্য মানসম্মত ও অন্তর্ভুক্তিমূলক শিক্ষা নিশ্চিত করতে UNESCO কাজ করে। শিক্ষার সুযোগ থেকে পিছিয়ে থাকা জনগোষ্ঠী, শিশু ও তরুণদের শিক্ষার আওতায় আনা এবং শিক্ষাব্যবস্থার উন্নয়নে সংস্থাটি বিভিন্ন দেশের সঙ্গে কাজ করে।
শিক্ষকদের দক্ষতা বৃদ্ধি, শিক্ষা নীতি প্রণয়ন এবং শিক্ষার মান উন্নয়নেও UNESCO কারিগরি সহায়তা দেয়।
২. বিশ্ব ঐতিহ্য সংরক্ষণ
UNESCO-এর সবচেয়ে পরিচিত কাজগুলোর একটি হলো World Heritage বা বিশ্ব ঐতিহ্য সংরক্ষণ।
ঐতিহাসিক স্থাপনা, প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন, প্রাকৃতিক অঞ্চল ও গুরুত্বপূর্ণ সাংস্কৃতিক স্থানকে বিশ্ব ঐতিহ্যের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়। এর ফলে এসব স্থান সংরক্ষণ ও আন্তর্জাতিকভাবে পরিচিত করার সুযোগ তৈরি হয়।
বাংলাদেশের সুন্দরবন, পাহাড়পুর বৌদ্ধ বিহার এবং বাগেরহাটের ঐতিহাসিক মসজিদ নগরী UNESCO-এর বিশ্ব ঐতিহ্যের তালিকায় রয়েছে।
৩. সংস্কৃতি সংরক্ষণ
বিভিন্ন দেশের ভাষা, ঐতিহ্য, শিল্প, কারুশিল্প, লোকসংস্কৃতি ও সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য সংরক্ষণেও UNESCO গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
বিশেষ করে বিলুপ্তির ঝুঁকিতে থাকা সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য সংরক্ষণ এবং প্রজন্মের পর প্রজন্ম তা টিকিয়ে রাখার জন্য আন্তর্জাতিক সহযোগিতা বাড়ানো সংস্থাটির অন্যতম কাজ।
৪. বিজ্ঞান ও গবেষণায় সহযোগিতা
পানি, সমুদ্র, পরিবেশ, জীববৈচিত্র্য ও টেকসই উন্নয়নের মতো বিভিন্ন বৈজ্ঞানিক বিষয়ে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা বাড়াতে UNESCO কাজ করে।
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির সুফল যেন বিভিন্ন দেশের মানুষের কাছে পৌঁছায় এবং বৈজ্ঞানিক জ্ঞানকে টেকসই উন্নয়নে কাজে লাগানো যায়, সেদিকেও সংস্থাটি গুরুত্ব দেয়।
৫. তথ্য ও গণমাধ্যমের স্বাধীনতা
স্বাধীন ও বহুমুখী গণমাধ্যম, তথ্যের সুযোগ এবং মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নিয়েও UNESCO কাজ করে।
সাংবাদিকদের নিরাপত্তা, গণমাধ্যমের স্বাধীনতা এবং মানুষের তথ্য পাওয়ার অধিকার নিয়ে সচেতনতা তৈরিতে সংস্থাটি বিভিন্ন উদ্যোগ গ্রহণ করে।
৬. বিশ্বব্যাপী সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য রক্ষা
বিশ্বের বিভিন্ন জাতি ও জনগোষ্ঠীর নিজস্ব সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য রয়েছে। UNESCO সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যকে গুরুত্ব দিয়ে বিভিন্ন সংস্কৃতির সংরক্ষণ ও পারস্পরিক সম্মান বৃদ্ধিতে কাজ করে।
UNESCO-এর বিশ্ব ঐতিহ্য তালিকা কেন গুরুত্বপূর্ণ?
কোনো স্থান UNESCO-এর World Heritage List -এ অন্তর্ভুক্ত হলে সেটি আন্তর্জাতিকভাবে বিশেষ গুরুত্ব লাভ করে। এতে ঐতিহ্যবাহী স্থানটির সংরক্ষণ, গবেষণা, পর্যটন ও জনসচেতনতা বৃদ্ধির সুযোগ তৈরি হতে পারে।
তবে বিশ্ব ঐতিহ্যের তালিকায় থাকা মানেই UNESCO ওই স্থানটির মালিক—এমনটি নয়। সংশ্লিষ্ট দেশের দায়িত্বেই ঐতিহ্য সংরক্ষণের মূল দায়িত্ব থাকে।
বাংলাদেশে UNESCO-এর ভূমিকা
বাংলাদেশের শিক্ষা, সংস্কৃতি, ঐতিহ্য ও ভাষার সঙ্গে UNESCO-এর কার্যক্রমের গুরুত্বপূর্ণ সম্পর্ক রয়েছে।
২১ ফেব্রুয়ারি আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে UNESCO-এর মাধ্যমে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি পাওয়ায় বাংলাদেশের ভাষা আন্দোলনের ইতিহাস বিশ্বব্যাপী পরিচিতি লাভ করেছে। পাশাপাশি বাংলাদেশের বিভিন্ন ঐতিহাসিক ও প্রাকৃতিক স্থান বিশ্ব ঐতিহ্যের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হওয়ায় দেশের ঐতিহ্য আন্তর্জাতিক পর্যায়ে আরও পরিচিত হয়েছে।
UNESCO কেন গুরুত্বপূর্ণ?
বর্তমান বিশ্বে উন্নয়ন শুধু অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির ওপর নির্ভর করে না। শিক্ষা, বিজ্ঞান, সংস্কৃতি, তথ্য ও ঐতিহ্য সংরক্ষণও একটি দেশের দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়নের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
এই ক্ষেত্রগুলোতে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা বাড়িয়ে শান্তি, জ্ঞান বিনিময়, সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য ও টেকসই উন্নয়নে UNESCO গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
