দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের শুরু

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পেছনে জার্মানির আগ্রাসী নীতি, প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পরের রাজনৈতিক পরিস্থিতি, ভার্সাই চুক্তির প্রভাব, নাৎসি শাসনের উত্থান এবং জার্মানি, ইতালি ও জাপানের সাম্রাজ্যবাদী নীতি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

১৯৩৯ সালের ১ সেপ্টেম্বর জার্মানি পোল্যান্ড আক্রমণ করলে যুদ্ধের সূচনা হয়। এর দুই দিন পর ব্রিটেন ও ফ্রান্স জার্মানির বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করে।

যুদ্ধে প্রধান পক্ষগুলো

যুদ্ধের প্রধান দুই পক্ষ ছিল—

অক্ষশক্তি: জার্মানি, ইতালি ও জাপান।

মিত্রশক্তি: প্রধানত যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স, সোভিয়েত ইউনিয়ন, যুক্তরাষ্ট্র ও চীনসহ আরও কয়েকটি দেশ।

যুদ্ধ চলাকালে বিভিন্ন দেশের অবস্থান পরিবর্তিত হলেও এই দুই পক্ষই মূল সামরিক শক্তি হিসেবে পরিচিত ছিল।

যুদ্ধের গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা

জার্মানির ইউরোপ অভিযান

যুদ্ধের শুরুতে জার্মানি দ্রুত ইউরোপের বিভিন্ন অঞ্চল দখল করতে থাকে। ১৯৪০ সালে ফ্রান্স পরাজিত হয় এবং জার্মানি পশ্চিম ইউরোপে শক্ত অবস্থান তৈরি করে।

এরপর ব্রিটেনকে পরাজিত করার লক্ষ্যে জার্মানি ব্যাপক বিমান হামলা চালায়। এই সংঘাত ইতিহাসে Battle of Britain নামে পরিচিত।

সোভিয়েত ইউনিয়নে জার্মানির আক্রমণ

১৯৪১ সালে জার্মানি সোভিয়েত ইউনিয়ন আক্রমণ করে। বিশাল ভূখণ্ডে দীর্ঘ ও ভয়াবহ যুদ্ধ শুরু হয়। পরবর্তীতে সোভিয়েত বাহিনী জার্মানির বিরুদ্ধে বড় ধরনের প্রতিরোধ গড়ে তোলে।

পার্ল হারবারে হামলা

৭ ডিসেম্বর ১৯৪১ জাপান যুক্তরাষ্ট্রের হাওয়াইয়ের Pearl Harbor নৌঘাঁটিতে হামলা চালায়। এর পর যুক্তরাষ্ট্র সরাসরি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে যোগ দেয়।

এর ফলে যুদ্ধ ইউরোপের গণ্ডি ছাড়িয়ে আরও বড় বৈশ্বিক সংঘাতে পরিণত হয়।

যুদ্ধের মোড় পরিবর্তন

১৯৪২-৪৩ সালের দিকে মিত্রশক্তি গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি যুদ্ধে সাফল্য পেতে শুরু করে। সোভিয়েত ফ্রন্টে জার্মানির পরাজয় এবং উত্তর আফ্রিকায় মিত্রশক্তির অগ্রগতি যুদ্ধের গতিপথ পরিবর্তনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

নরম্যান্ডি অবতরণ

৬ জুন ১৯৪৪ মিত্রবাহিনী ফ্রান্সের নরম্যান্ডিতে বড় আকারের সামরিক অভিযান শুরু করে। এই অভিযান D-Day নামে পরিচিত।

এর মাধ্যমে পশ্চিম ইউরোপে জার্মানির বিরুদ্ধে মিত্রবাহিনীর বড় আকারের অগ্রযাত্রা শুরু হয়।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের শেষ

১৯৪৫ সালে মিত্রবাহিনী জার্মানির দিকে অগ্রসর হয়। ৩০ এপ্রিল ১৯৪৫ অ্যাডলফ হিটলার আত্মহত্যা করেন। এরপর ৮ মে ১৯৪৫ ইউরোপে জার্মানির আত্মসমর্পণের মাধ্যমে ইউরোপীয় যুদ্ধের সমাপ্তি ঘটে।

তবে এশিয়ায় যুদ্ধ তখনও চলছিল। ১৯৪৫ সালের আগস্টে যুক্তরাষ্ট্র জাপানের হিরোশিমা ও নাগাসাকিতে পারমাণবিক বোমা নিক্ষেপ করে। এর পর জাপান আত্মসমর্পণের সিদ্ধান্ত নেয়।

২ সেপ্টেম্বর ১৯৪৫ আনুষ্ঠানিক আত্মসমর্পণের মাধ্যমে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সমাপ্তি ঘটে।

১. ব্যাপক প্রাণহানি

যুদ্ধে সৈন্য ও বেসামরিক মানুষ মিলিয়ে কোটি কোটি মানুষ নিহত হয় । হলোকাস্টে প্রায় ৬০ লাখ ইহুদিসহ বিপুলসংখ্যক মানুষকে নাৎসি জার্মানি হত্যা করে।

২. ইউরোপের ব্যাপক ধ্বংস

যুদ্ধের কারণে ইউরোপের বহু শহর, শিল্পকারখানা, সড়ক, রেলপথ ও অবকাঠামো ধ্বংস হয়। যুদ্ধ শেষে ইউরোপের অনেক দেশকে পুনর্গঠনের বড় চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে হয়।

৩. জাতিসংঘ প্রতিষ্ঠা

যুদ্ধের ভয়াবহতার পর আন্তর্জাতিক শান্তি ও নিরাপত্তা বজায় রাখার উদ্দেশ্যে ১৯৪৫ সালে জাতিসংঘ (United Nations) প্রতিষ্ঠিত হয়।

৪. যুক্তরাষ্ট্র ও সোভিয়েত ইউনিয়নের উত্থান

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর যুক্তরাষ্ট্র ও সোভিয়েত ইউনিয়ন বিশ্বের দুই প্রধান পরাশক্তিতে পরিণত হয়। তাদের মধ্যে রাজনৈতিক ও সামরিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা থেকেই পরবর্তীতে স্নায়ুযুদ্ধ শুরু হয়।

৫. উপনিবেশবাদ দুর্বল হয়ে পড়ে

যুদ্ধের পর ইউরোপীয় ঔপনিবেশিক শক্তিগুলো অর্থনৈতিক ও সামরিকভাবে দুর্বল হয়ে পড়ে। ফলে এশিয়া ও আফ্রিকার বিভিন্ন অঞ্চলে স্বাধীনতা আন্দোলন আরও শক্তিশালী হয় এবং পরবর্তী কয়েক দশকে বহু নতুন রাষ্ট্রের জন্ম হয়।

৬. জার্মানির বিভক্তি

যুদ্ধের পর জার্মানি দখলদার মিত্রশক্তির নিয়ন্ত্রণে আসে। পরবর্তীতে জার্মানি পশ্চিম জার্মানি ও পূর্ব জার্মানি —দুটি রাষ্ট্রে বিভক্ত হয়।

৭. বিশ্ব রাজনীতির বড় পরিবর্তন

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর আন্তর্জাতিক রাজনীতির কেন্দ্র ইউরোপ থেকে ধীরে ধীরে যুক্তরাষ্ট্র ও সোভিয়েত ইউনিয়নকে ঘিরে গড়ে ওঠে। সামরিক জোট, পারমাণবিক অস্ত্র প্রতিযোগিতা এবং আদর্শগত দ্বন্দ্ব বিশ্ব রাজনীতির নতুন বাস্তবতা তৈরি করে।

১৯৩৯ সালে জার্মানির পোল্যান্ড আক্রমণের মাধ্যমে শুরু হয়ে ১৯৪৫ সালে জাপানের আত্মসমর্পণের মধ্য দিয়ে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষ হয়। এই যুদ্ধে বিপুল প্রাণহানি ও ধ্বংসের পাশাপাশি বিশ্ব রাজনীতিতে বড় পরিবর্তন আসে।

যুদ্ধের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ফল ছিল জাতিসংঘের প্রতিষ্ঠা, যুক্তরাষ্ট্র ও সোভিয়েত ইউনিয়নের পরাশক্তি হিসেবে উত্থান, স্নায়ুযুদ্ধের সূচনা, উপনিবেশবাদের দুর্বলতা এবং বিশ্বের রাজনৈতিক মানচিত্রের ব্যাপক পরিবর্তন।