প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পেছনে একটি মাত্র কারণ ছিল না। সামরিক জোট, জাতীয়তাবাদ, সাম্রাজ্যবাদ, অস্ত্র প্রতিযোগিতা এবং ইউরোপের দেশগুলোর মধ্যে রাজনৈতিক উত্তেজনা —সব মিলিয়ে যুদ্ধের পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল।
প্রথম বিশ্বযুদ্ধের প্রধান কারণ
১. সামরিক জোটের প্রতিযোগিতা
যুদ্ধের আগে ইউরোপের বড় দেশগুলো পরস্পরের সঙ্গে বিভিন্ন সামরিক জোট তৈরি করেছিল। ফলে একটি দেশের সঙ্গে সংঘাত শুরু হলে তার মিত্র দেশগুলোও যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়।
প্রধানত দুটি জোট গুরুত্বপূর্ণ ছিল—
- Triple Alliance: জার্মানি, অস্ট্রিয়া-হাঙ্গেরি ও ইতালি
- Triple Entente: ব্রিটেন, ফ্রান্স ও রাশিয়া
এই জোট ব্যবস্থা ইউরোপের রাজনৈতিক পরিস্থিতিকে আরও উত্তেজনাপূর্ণ করে তোলে।
২. জাতীয়তাবাদের উত্থান
ইউরোপের বিভিন্ন দেশে জাতীয়তাবাদী চিন্তা শক্তিশালী হয়ে উঠেছিল। বিশেষ করে বলকান অঞ্চলে বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠী নিজেদের স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার দাবি তুলছিল।
সার্বিয়া ও অস্ট্রিয়া-হাঙ্গেরির মধ্যে উত্তেজনাও এ সময় বাড়তে থাকে। এই আঞ্চলিক বিরোধ পরবর্তীতে বৃহত্তর ইউরোপীয় সংঘাতে রূপ নেয়।
৩. সাম্রাজ্য বিস্তারের প্রতিযোগিতা
ব্রিটেন, ফ্রান্স, জার্মানি ও অন্যান্য ইউরোপীয় শক্তি বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে নিজেদের উপনিবেশ ও প্রভাব বিস্তারের প্রতিযোগিতায় লিপ্ত ছিল।
আফ্রিকা ও এশিয়ায় অঞ্চল ও সম্পদের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে বড় শক্তিগুলোর মধ্যে প্রতিদ্বন্দ্বিতা তাদের পারস্পরিক সম্পর্ককে আরও উত্তেজনাপূর্ণ করে তোলে।
৪. অস্ত্র প্রতিযোগিতা
যুদ্ধের আগের কয়েক দশকে ইউরোপের শক্তিশালী দেশগুলো দ্রুত সামরিক শক্তি বাড়াতে থাকে। সেনাবাহিনী সম্প্রসারণের পাশাপাশি আধুনিক অস্ত্র ও যুদ্ধজাহাজ তৈরির প্রতিযোগিতাও শুরু হয়।
বিশেষ করে ব্রিটেন ও জার্মানির মধ্যে নৌবাহিনী শক্তিশালী করার প্রতিযোগিতা উত্তেজনা বাড়িয়ে দেয়।
৫. ইউরোপের রাজনৈতিক উত্তেজনা
জার্মানি, ফ্রান্স, ব্রিটেন, রাশিয়া ও অস্ট্রিয়া-হাঙ্গেরির মধ্যে বিভিন্ন রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক বিরোধ ছিল। এর ফলে ইউরোপে এমন একটি পরিস্থিতি তৈরি হয়, যেখানে ছোট একটি সংঘাতও বড় যুদ্ধের কারণ হতে পারত।
তাৎক্ষণিক কারণ: আর্চডিউক ফ্রাঞ্জ ফার্ডিনান্ড হত্যাকাণ্ড
প্রথম বিশ্বযুদ্ধ শুরুর সরাসরি বা তাৎক্ষণিক কারণ ছিল অস্ট্রিয়া-হাঙ্গেরির যুবরাজ আর্চডিউক ফ্রাঞ্জ ফার্ডিনান্ডের হত্যাকাণ্ড ।
১৯১৪ সালের ২৮ জুন বসনিয়ার সারায়েভোতে সার্বিয়ান জাতীয়তাবাদী গ্যাভরিলো প্রিন্সিপ ফ্রাঞ্জ ফার্ডিনান্ড ও তার স্ত্রী সোফিকে হত্যা করেন।
এরপর অস্ট্রিয়া-হাঙ্গেরি সার্বিয়ার বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করে। সার্বিয়ার পাশে রাশিয়া অবস্থান নেয়। অন্যদিকে জার্মানি অস্ট্রিয়া-হাঙ্গেরিকে সমর্থন করে। পরে বিভিন্ন সামরিক জোটের কারণে ব্রিটেন, ফ্রান্সসহ আরও কয়েকটি দেশ যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে।
এভাবেই একটি আঞ্চলিক সংঘাত দ্রুত বিশ্বযুদ্ধে পরিণত হয়।
যুদ্ধের ফল কী হয়েছিল?
প্রথম বিশ্বযুদ্ধে লাখ লাখ মানুষ নিহত ও আহত হয়। ইউরোপের অর্থনীতি ও অবকাঠামো ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। যুদ্ধের পর জার্মানি ও তার মিত্রদের ওপর কঠোর শর্ত আরোপ করা হয় , বিশেষ করে ১৯১৯ সালের ভার্সাই চুক্তির মাধ্যমে।
এ যুদ্ধের পর ইউরোপের রাজনৈতিক মানচিত্রেও বড় পরিবর্তন আসে এবং কয়েকটি সাম্রাজ্যের পতন ঘটে।
