বাংলাদেশের নির্বাচন কমিশন (ইসি) একটি সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান। দেশের জাতীয় ও স্থানীয় নির্বাচন পরিচালনা, ভোটার তালিকা প্রণয়ন এবং নির্বাচনসংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করে প্রতিষ্ঠানটি। স্বাধীনতার পর দেশের গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা গড়ে তোলার অংশ হিসেবে নির্বাচন কমিশনের যাত্রা শুরু হয়।
প্রতিষ্ঠার ইতিহাস
বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর ১৯৭২ সালের সংবিধানে নির্বাচন কমিশন প্রতিষ্ঠার সাংবিধানিক ভিত্তি তৈরি করা হয়। সংবিধানের ১১৮ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী বাংলাদেশে একটি নির্বাচন কমিশন থাকবে। কমিশনে একজন প্রধান নির্বাচন কমিশনার এবং রাষ্ট্রপতি নির্ধারিত সংখ্যক নির্বাচন কমিশনার থাকার বিধান রয়েছে।
স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম প্রধান নির্বাচন কমিশনার ছিলেন বিচারপতি মোহাম্মদ ইদ্রিস। তাঁর নেতৃত্বে কমিশন দেশের প্রথম জাতীয় সংসদ নির্বাচন আয়োজনের প্রস্তুতি নেয়।
প্রথম জাতীয় নির্বাচন
স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় ১৯৭৩ সালের ৭ মার্চ। নির্বাচন কমিশনের জন্য এটি ছিল একটি বড় দায়িত্ব ও গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা। এই নির্বাচনের মাধ্যমে স্বাধীন বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক ও সংসদীয় রাজনৈতিক ব্যবস্থার আনুষ্ঠানিক যাত্রা আরও সুসংহত হয়।
সামরিক শাসন ও নির্বাচন কমিশন
১৯৭৫ সালের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর বাংলাদেশের রাজনৈতিক ব্যবস্থায় বড় ধরনের পরিবর্তন আসে। পরবর্তী সময়ে সামরিক শাসনের অধীনেও নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। ১৯৭৯, ১৯৮৬ ও ১৯৮৮ সালের জাতীয় নির্বাচন নির্বাচন কমিশনের তত্ত্বাবধানে অনুষ্ঠিত হলেও এসব নির্বাচন নিয়ে রাজনৈতিক বিতর্ক ও বিরোধী দলের আপত্তি ছিল।
বিশেষ করে ১৯৮৮ সালের নির্বাচন প্রধান বিরোধী দলগুলোর বর্জনের কারণে ব্যাপকভাবে বিতর্কিত হয়।
১৯৯০-এর পর নির্বাচন কমিশনের পরিবর্তন
১৯৯০ সালে এরশাদ সরকারের পতনের পর নির্বাচন কমিশনের ওপর একটি অবাধ ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন আয়োজনের দায়িত্ব আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। ১৯৯১ সালের জাতীয় নির্বাচন তুলনামূলকভাবে অংশগ্রহণমূলক হওয়ায় নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা নতুন করে গুরুত্ব পায়।
১৯৯৬ সালে রাজনৈতিক সংকটের পর তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচন আয়োজনের ব্যবস্থা চালু হয়। জুন ১৯৯৬-এর নির্বাচনসহ পরবর্তী কয়েকটি জাতীয় নির্বাচনে নির্বাচন কমিশন এই ব্যবস্থার অধীনে নির্বাচন পরিচালনা করে।
নির্বাচন কমিশনের আধুনিকায়ন
সময়ের সঙ্গে নির্বাচন কমিশনের কার্যক্রমে প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়তে থাকে। ছবিসহ ভোটার তালিকা, জাতীয় পরিচয়পত্র, ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিন (ইভিএম) এবং অনলাইনভিত্তিক বিভিন্ন সেবা চালুর মাধ্যমে নির্বাচন ব্যবস্থায় প্রযুক্তিগত পরিবর্তন এসেছে।
বিশেষ করে ২০০৭-০৮ সালের সময়কালে ছবিসহ ভোটার তালিকা তৈরির উদ্যোগ নির্বাচন ব্যবস্থায় গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন আনে।
সাংবিধানিক ও আইনগত পরিবর্তন
নির্বাচন কমিশনের গঠন ও দায়িত্ব নির্ধারণে সংবিধানের পাশাপাশি বিভিন্ন আইন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। ২০২২ সালে প্রধান নির্বাচন কমিশনার ও নির্বাচন কমিশনার নিয়োগ আইন প্রণয়ন করা হয়। এর মাধ্যমে প্রধান নির্বাচন কমিশনার ও অন্যান্য নির্বাচন কমিশনার নিয়োগের ক্ষেত্রে একটি আইনি কাঠামো তৈরি হয়।
নির্বাচন কমিশনের প্রধান দায়িত্ব
বাংলাদেশ নির্বাচন কমিশনের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বগুলোর মধ্যে রয়েছে—
- জাতীয় ও স্থানীয় সরকার নির্বাচন পরিচালনা করা
- ভোটার তালিকা প্রস্তুত ও হালনাগাদ করা
- জাতীয় পরিচয়পত্র সংক্রান্ত কার্যক্রম পরিচালনা করা
- নির্বাচনী এলাকার সীমানা নির্ধারণ করা
- রাজনৈতিক দল নিবন্ধন করা
- নির্বাচনী আইন ও বিধিমালা বাস্তবায়ন করা
- নির্বাচনকে সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষভাবে পরিচালনার জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া
কেন নির্বাচন কমিশন গুরুত্বপূর্ণ?
গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। একটি স্বাধীন, নিরপেক্ষ ও কার্যকর নির্বাচন কমিশন জনগণের ভোটাধিকার নিশ্চিত করতে এবং নির্বাচনের প্রতি মানুষের আস্থা তৈরি করতে সহায়তা করে। তাই বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক বিকাশের ইতিহাসে নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ ও আলোচিত একটি বিষয়।
সংক্ষেপে, স্বাধীনতার পর ১৯৭২ সালের সংবিধানের মাধ্যমে সাংবিধানিক ভিত্তি পাওয়া বাংলাদেশের নির্বাচন কমিশন ১৯৭৩ সালের প্রথম জাতীয় নির্বাচন থেকে শুরু করে বিভিন্ন জাতীয় ও স্থানীয় নির্বাচন পরিচালনা করে আসছে। সময়ের সঙ্গে এর কাঠামো, প্রযুক্তি ও দায়িত্বে পরিবর্তন এলেও অবাধ, সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন আয়োজন করাই প্রতিষ্ঠানটির মূল দায়িত্ব।