স্পোর্টস ডেস্ক: একসময় আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে বাংলাদেশের নাম ছিল অনেকটাই অপরিচিত। টেস্ট মর্যাদা তো দূরের কথা, বিশ্বকাপের মূল আসরে জায়গা করে নেওয়াই ছিল বড় স্বপ্ন। কিন্তু কয়েক দশকের পথচলায় সেই বাংলাদেশই এখন আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের নিয়মিত প্রতিযোগী। ঘরোয়া ক্রিকেটের বিকাশ, আইসিসির সহযোগী সদস্য থেকে পূর্ণ সদস্য হওয়া এবং আন্তর্জাতিক মঞ্চে একের পর এক স্মরণীয় সাফল্য—সব মিলিয়ে বাংলাদেশের ক্রিকেটের ইতিহাস সংগ্রাম ও উত্থানের গল্প।
বাংলাদেশের ক্রিকেটের শুরু কোথায়?
বাংলাদেশে ক্রিকেটের শিকড় অনেক পুরোনো হলেও স্বাধীনতার পর ক্রিকেট নতুনভাবে সংগঠিত হতে শুরু করে। ১৯৭২ সালে বাংলাদেশ ক্রিকেট কন্ট্রোল বোর্ড গঠিত হয়, যা পরবর্তীতে বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড বা BCB নামে পরিচিত হয়।
স্বাধীনতার পর দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ক্রিকেট প্রতিযোগিতা বাড়তে থাকে। ধীরে ধীরে জাতীয় পর্যায়ে খেলোয়াড় তৈরি ও ঘরোয়া ক্রিকেটের কাঠামো গড়ে ওঠে।
১৯৭৭ সালে আইসিসির সহযোগী সদস্য
বাংলাদেশের ক্রিকেটের আন্তর্জাতিক যাত্রায় গুরুত্বপূর্ণ বছর ১৯৭৭। ওই বছর বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক ক্রিকেট কাউন্সিলের (ICC) সহযোগী সদস্য হয়।
এর ফলে বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক পর্যায়ে আরও বেশি ক্রিকেট খেলার সুযোগ পেতে শুরু করে এবং বড় দলগুলোর সঙ্গে প্রতিযোগিতার পথ খুলে যায়।
১৯৯৭—একটি ঐতিহাসিক বাঁক
বাংলাদেশ ক্রিকেটের ইতিহাসে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বছরগুলোর একটি ১৯৯৭।
মালয়েশিয়ায় অনুষ্ঠিত ICC Trophy-তে বাংলাদেশ কেনিয়ার বিপক্ষে ঐতিহাসিক জয় তুলে নিয়ে চ্যাম্পিয়ন হয়। এই সাফল্যের মাধ্যমে বাংলাদেশ ১৯৯৯ সালের ক্রিকেট বিশ্বকাপে খেলার যোগ্যতা অর্জন করে।
ফাইনালে কেনিয়াকে হারিয়ে ট্রফি জয়ের পর বাংলাদেশের ক্রিকেটে নতুন আশার সৃষ্টি হয়।
১৯৯৯ বিশ্বকাপ—বিশ্বমঞ্চে বাংলাদেশের আগমন
১৯৯৯ সালে প্রথমবার ওয়ানডে বিশ্বকাপের মূল আসরে অংশ নেয় বাংলাদেশ।
বিশ্বকাপে বাংলাদেশের সবচেয়ে আলোচিত ম্যাচ ছিল পাকিস্তানের বিপক্ষে। শক্তিশালী পাকিস্তানকে ৬২ রানে হারিয়ে বাংলাদেশ বিশ্ব ক্রিকেটে বড় চমক তৈরি করে।
সেই জয় শুধু একটি ম্যাচের ফল ছিল না; এটি বাংলাদেশের ক্রিকেটকে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নতুন পরিচিতি দেয়।
২০০০ সালে টেস্ট মর্যাদা
বিশ্বকাপে সাফল্যের পর বাংলাদেশের ক্রিকেটে আসে সবচেয়ে বড় স্বীকৃতি।
১০ নভেম্বর ২০০০ সালে বাংলাদেশ টেস্ট ক্রিকেটের দশম পূর্ণ সদস্য দেশ হিসেবে মর্যাদা লাভ করে। ভারতের বিপক্ষে ঢাকার বঙ্গবন্ধু জাতীয় স্টেডিয়ামে বাংলাদেশের প্রথম টেস্ট ম্যাচ অনুষ্ঠিত হয়।
বাংলাদেশের টেস্ট অভিষেক ম্যাচের অধিনায়ক ছিলেন নাঈমুর রহমান দুর্জয়।
এর মাধ্যমে বাংলাদেশ ক্রিকেটের সবচেয়ে দীর্ঘ ও ঐতিহ্যবাহী ফরম্যাটে আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু করে।
প্রথম টেস্ট জয়
টেস্ট মর্যাদা পাওয়ার পর প্রথম জয় পেতে বাংলাদেশকে অপেক্ষা করতে হয় বেশ কয়েক বছর।
২০০৫ সালে জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে বাংলাদেশ প্রথম টেস্ট জয় অর্জন করে। চট্টগ্রামে অনুষ্ঠিত ম্যাচে বাংলাদেশের জয় ছিল ক্রিকেট ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক।
এই জয় প্রমাণ করে, টেস্ট ক্রিকেটেও বাংলাদেশ ধীরে ধীরে নিজেদের অবস্থান শক্ত করতে পারছে।
প্রথম ওয়ানডে সিরিজ জয়
২০০৫ সালেই বাংলাদেশের ক্রিকেটে আসে আরেকটি বড় সাফল্য। জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে ওয়ানডে সিরিজে বাংলাদেশ ৩-২ ব্যবধানে জয় পায়।
এর আগে ২০০৪ সালে ঘরের মাঠে ভারতকে হারিয়ে বাংলাদেশ ওয়ানডেতে বড় দলের বিপক্ষে নিজেদের সামর্থ্যের প্রমাণ দিয়েছিল।
২০০৭ বিশ্বকাপ—ভারতকে হারিয়ে চমক
২০০৭ সালের ওয়ানডে বিশ্বকাপে বাংলাদেশ আবারও বিশ্ব ক্রিকেটকে চমকে দেয়।
পোর্ট অব স্পেনে ভারতের বিপক্ষে ম্যাচে বাংলাদেশ ৫ উইকেটে জয় পায়। তামিম ইকবাল, মুশফিকুর রহিম ও সাকিব আল হাসানের মতো তরুণ ক্রিকেটাররা সেই ম্যাচে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন।
বাংলাদেশ শেষ পর্যন্ত ওই বিশ্বকাপের সুপার এইটে জায়গা করে নেয়।
২০১১ বিশ্বকাপ—নিজেদের মাটিতে বড় আসর
২০১১ সালে বাংলাদেশ ভারত ও শ্রীলঙ্কার সঙ্গে যৌথভাবে ক্রিকেট বিশ্বকাপ আয়োজন করে। দেশের মাটিতে বিশ্বকাপ হওয়ায় ক্রিকেটপ্রেমীদের মধ্যে ব্যাপক উন্মাদনা তৈরি হয়।
উদ্বোধনী ম্যাচেই বাংলাদেশ ভারতের মুখোমুখি হয়। ম্যাচে ভারত জয় পেলেও বিশ্বকাপ আয়োজন বাংলাদেশের ক্রিকেট অবকাঠামো ও জনপ্রিয়তার ক্ষেত্রে নতুন মাত্রা যোগ করে।
২০১৫—বাংলাদেশের সোনালি সময়ের শুরু
২০১৫ সালের বিশ্বকাপ বাংলাদেশের ক্রিকেট ইতিহাসে বিশেষভাবে স্মরণীয়।
ইংল্যান্ডকে হারিয়ে বাংলাদেশ প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালে জায়গা করে নেয়। ম্যাচটিতে মাহমুদউল্লাহ রিয়াদ সেঞ্চুরি করেন এবং মাশরাফি বিন মুর্তজার নেতৃত্বে বাংলাদেশ দুর্দান্ত পারফরম্যান্স দেখায়।
এই সময়টিকে বাংলাদেশের ওয়ানডে ক্রিকেটের অন্যতম সফল অধ্যায় হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
২০১৫ সালের পর বড় দলগুলোর বিপক্ষে সাফল্য
বিশ্বকাপের পর বাংলাদেশ ঘরের মাঠে পাকিস্তান, ভারত ও দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে ওয়ানডে সিরিজে উল্লেখযোগ্য সাফল্য অর্জন করে।
২০১৫ সালে পাকিস্তানকে ওয়ানডে সিরিজে ৩-০, ভারতকে ২-১ এবং দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে ২-১ ব্যবধানে সিরিজ জয় বাংলাদেশের ক্রিকেটের আত্মবিশ্বাস আরও বাড়িয়ে দেয়।
২০১৭ চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফি—সেমিফাইনালে বাংলাদেশ
২০১৭ সালের ICC Champions Trophy-তে বাংলাদেশ ইতিহাসের অন্যতম বড় সাফল্য অর্জন করে।
গ্রুপ পর্ব পেরিয়ে বাংলাদেশ সেমিফাইনালে উঠে যায়। নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচে সাকিব আল হাসান ও মাহমুদউল্লাহর অসাধারণ জুটি বাংলাদেশের জয় নিশ্চিত করে।
সেমিফাইনালে ভারত বাংলাদেশের পথ আটকে দিলেও টুর্নামেন্টে শেষ চার নিশ্চিত করা ছিল বড় অর্জন।
২০১৯ বিশ্বকাপ—সাকিবের অসাধারণ পারফরম্যান্স
২০১৯ সালের বিশ্বকাপে বাংলাদেশ চতুর্থবারের মতো মূল আসরে অংশ নেয়।
বিশ্বকাপে সাকিব আল হাসান ব্যাট ও বল হাতে অসাধারণ পারফরম্যান্স করেন। তিনি টুর্নামেন্টে ৬০৬ রান ও ১১ উইকেট নিয়ে বিশ্বকাপের অন্যতম সেরা অলরাউন্ড পারফরম্যান্স উপহার দেন।
বাংলাদেশ অবশ্য সেমিফাইনালে উঠতে পারেনি, তবে সাকিবের পারফরম্যান্স বিশ্বজুড়ে প্রশংসিত হয়।
২০২২—প্রথমবার T20 বিশ্বকাপের সুপার ১২
T20 ক্রিকেটেও বাংলাদেশ ধীরে ধীরে নিজেদের জায়গা তৈরি করেছে। T20 বিশ্বকাপের বিভিন্ন আসরে অংশ নেওয়ার পর বাংলাদেশ ২০২২ সালে সুপার ১২ পর্বে গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচে জয়ের মাধ্যমে প্রতিযোগিতামূলক অবস্থান দেখায়।
পরবর্তীতে T20 ফরম্যাটে তরুণ খেলোয়াড়দের উত্থান বাংলাদেশের ক্রিকেটে নতুন সম্ভাবনা তৈরি করেছে।
নারী ক্রিকেটেও বাংলাদেশের সাফল্য
বাংলাদেশের ক্রিকেটের ইতিহাস শুধু পুরুষ দলের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। নারী ক্রিকেটও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে গুরুত্বপূর্ণ সাফল্য পেয়েছে।
২০১৮ সালে বাংলাদেশ নারী দল এশিয়া কাপ টি-টোয়েন্টি জিতে ইতিহাস তৈরি করে। ফাইনালে ভারতকে হারিয়ে বাংলাদেশ প্রথমবারের মতো নারী এশিয়া কাপের শিরোপা অর্জন করে।
এটি বাংলাদেশের নারী ক্রিকেটের অন্যতম বড় সাফল্য।
বাংলাদেশের ক্রিকেটে তারকাদের অবদান
বাংলাদেশের ক্রিকেটকে এগিয়ে নেওয়ার পেছনে অনেক ক্রিকেটারের অবদান রয়েছে।
মোহাম্মদ আশরাফুল আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে বাংলাদেশের প্রথম বড় তারকাদের একজন ছিলেন। তার পরবর্তী সময়ে মাশরাফি বিন মুর্তজা, সাকিব আল হাসান, তামিম ইকবাল, মুশফিকুর রহিম ও মাহমুদউল্লাহ বাংলাদেশের ক্রিকেটের অন্যতম প্রধান মুখ হয়ে ওঠেন।
বর্তমান প্রজন্মে লিটন দাস, মেহেদী হাসান মিরাজ, মুস্তাফিজুর রহমানসহ আরও অনেক ক্রিকেটার আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করছেন।
বাংলাদেশের ক্রিকেটের সবচেয়ে বড় অর্জন কী?
বাংলাদেশ এখনও পুরুষদের ওয়ানডে বিশ্বকাপ বা T20 বিশ্বকাপ জিততে পারেনি। তবে বিশ্বকাপের নকআউট পর্বে জায়গা করে নেওয়া, বড় দলকে হারানো এবং চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফির সেমিফাইনালে ওঠার মতো সাফল্য বাংলাদেশের ক্রিকেটের অগ্রযাত্রার প্রমাণ।
এ ছাড়া টেস্ট ক্রিকেটে শক্তিশালী দলের বিপক্ষে জয় এবং বিদেশের মাটিতে সিরিজ জয়ের ঘটনাও বাংলাদেশের ক্রিকেটের উন্নতির গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ।
শূন্য থেকে বিশ্বমঞ্চে—কতটা বদলেছে বাংলাদেশ?
১৯৭০-এর দশকে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে যাত্রা শুরু করা বাংলাদেশ আজ ICC-এর পূর্ণ সদস্য দেশ। দেশের ঘরোয়া ক্রিকেটে নিয়মিত প্রতিযোগিতা হচ্ছে, ক্রিকেট একাডেমি ও বয়সভিত্তিক পর্যায় থেকে খেলোয়াড় উঠে আসছে এবং বাংলাদেশ প্রিমিয়ার লিগের মতো ফ্র্যাঞ্চাইজি প্রতিযোগিতাও নতুন প্রজন্মের ক্রিকেটারদের সুযোগ তৈরি করছে।
তবে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে স্থায়ীভাবে বড় দলগুলোর সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে হলে ঘরোয়া ক্রিকেটের মান, খেলোয়াড় তৈরির কাঠামো, ফিটনেস ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনায় আরও উন্নতি প্রয়োজন।
বাংলাদেশের ক্রিকেটের গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক
| বছর | ঘটনা |
|---|---|
| ১৯৭২ | বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড গঠিত |
| ১৯৭৭ | ICC-এর সহযোগী সদস্যপদ লাভ |
| ১৯৯৭ | ICC Trophy জয় ও বিশ্বকাপে জায়গা নিশ্চিত |
| ১৯৯৯ | প্রথম ওয়ানডে বিশ্বকাপ ও পাকিস্তানকে হারানো |
| ২০০০ | টেস্ট মর্যাদা লাভ ও ভারতের বিপক্ষে টেস্ট অভিষেক |
| ২০০৫ | প্রথম টেস্ট জয় |
| ২০০৭ | বিশ্বকাপে ভারতকে হারিয়ে সুপার এইটে |
| ২০১৫ | বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনাল |
| ২০১৭ | Champions Trophy-তে সেমিফাইনাল |
| ২০১৮ | বাংলাদেশ নারী দলের এশিয়া কাপ জয় |
| ২০১৯ | বিশ্বকাপে সাকিবের ৬০৬ রান ও ১১ উইকেট |
শেষ কথা
বাংলাদেশ ক্রিকেটের ইতিহাস মূলত সংগ্রাম, সাফল্য ও নতুন স্বপ্নের গল্প। ১৯৭০-এর দশকে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে যাত্রা শুরু করে মাত্র দুই দশকের মধ্যে বিশ্বকাপের মঞ্চে জায়গা করে নেওয়া এবং ২০০০ সালে টেস্ট মর্যাদা পাওয়া ছিল বিশাল অর্জন।
এরপর বড় দলকে হারানো, বিশ্বকাপের নকআউট পর্বে ওঠা এবং আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে নিজেদের আলাদা পরিচয় তৈরি করেছে বাংলাদেশ।
বিশ্বকাপের শিরোপা এখনো অধরা হলেও বাংলাদেশের ক্রিকেটের পথচলা থেমে নেই। শূন্য থেকে বিশ্বমঞ্চে উঠে আসার এই যাত্রাই বাংলাদেশের ক্রিকেটের সবচেয়ে বড় গল্প।