স্পোর্টস ডেস্ক: ক্রিকেট মাঠে আম্পায়ার শুধু বল ও ব্যাটারের খেলা পর্যবেক্ষণ করেন না, বিভিন্ন সিদ্ধান্ত জানাতে নির্দিষ্ট হাতের ইশারা বা সিগন্যাল ব্যবহার করেন। মাঠে থাকা খেলোয়াড় থেকে শুরু করে স্টেডিয়ামের দর্শক এবং টেলিভিশনে ম্যাচ দেখা দর্শকরাও এসব সিগন্যালের মাধ্যমে বুঝতে পারেন আম্পায়ারের সিদ্ধান্ত কী।
ক্রিকেটের প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তের জন্য রয়েছে আলাদা সিগন্যাল। তাই একজন ক্রিকেটপ্রেমীর কাছে এসব সিগন্যালের অর্থ জানা থাকলে খেলা বোঝা আরও সহজ হয়ে যায়।
১. আউট — তর্জনী আঙুল ওপরে
ক্রিকেটের সবচেয়ে পরিচিত আম্পায়ার সিগন্যাল হলো আউট।
কোনো ব্যাটার আউট হলে আম্পায়ার সাধারণত এক হাতের তর্জনী আঙুল সোজা করে ওপরে তোলেন। এই ইশারা দেখলেই বোঝা যায় ব্যাটারকে আউট দেওয়া হয়েছে।
ক্যাচ, এলবিডব্লিউ, বোল্ডসহ বিভিন্নভাবে আউটের ক্ষেত্রে এই সিগন্যাল ব্যবহার করা হয়।
২. চার রান — দুই হাত ছড়িয়ে দেওয়া
ব্যাটারের শট মাটিতে বা অন্য কোনো বৈধ উপায়ে বাউন্ডারি স্পর্শ করলে চার রান হলে আম্পায়ার সাধারণত দুই হাত দুই পাশে ছড়িয়ে দেন।
এটি ক্রিকেটের অন্যতম সহজে চেনা সিগন্যাল।
৩. ছয় রান — দুই হাত মাথার ওপরে
ব্যাটার বল সরাসরি বাউন্ডারির বাইরে পাঠিয়ে ছয় রান করলে আম্পায়ার দুই হাত মাথার ওপর তুলে ধরেন।
চার ও ছয়ের সিগন্যালের মধ্যে পার্থক্যটি খুব সহজ—চার রানের ক্ষেত্রে হাত দুই পাশে, আর ছয়ের ক্ষেত্রে দুই হাত মাথার ওপরে।
৪. ওয়াইড — দুই হাত দুই পাশে
বোলারের বল ব্যাটারের স্বাভাবিক নাগালের বাইরে চলে গেলে আম্পায়ার দুই হাত অনুভূমিকভাবে দুই পাশে ছড়িয়ে দেন। এর অর্থ হলো ওয়াইড।
ওয়াইড হলে ব্যাটিং দল সাধারণত একটি অতিরিক্ত রান পায় এবং বলটি বৈধ ডেলিভারি হিসেবে গণনা হয় না।
৫. নো বল — এক হাত পাশে প্রসারিত
বোলার নিয়ম ভঙ্গ করে বল করলে আম্পায়ার এক হাত অনুভূমিকভাবে পাশে প্রসারিত করেন। এটি নো বলের সিগন্যাল।
ফ্রন্ট-ফুট নো বলসহ বিভিন্ন পরিস্থিতিতে এই সিগন্যাল ব্যবহার করা হয়। সীমিত ওভারের ক্রিকেটে নো বলের পর পরবর্তী ডেলিভারি অনেক ক্ষেত্রে ফ্রি হিট হয়।
৬. ডেড বল — কবজির ওপর হাত রাখা
কোনো কারণে বল আর খেলার মধ্যে নেই বা খেলা সাময়িকভাবে বন্ধ হয়েছে বোঝাতে আম্পায়ার এক হাতের কবজির ওপর অন্য হাত রাখেন।
এটি ডেড বলের সিগন্যাল।
৭. বাই — মাথার ওপর এক হাত
ব্যাটার বল স্পর্শ না করলেও বলের মাধ্যমে রান হলে এবং সেটি ওয়াইড না হলে বাই হতে পারে। বাই ঘোষণা করতে আম্পায়ার এক হাত মাথার ওপর তোলেন।
উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, বল ব্যাটারকে পাশ কাটিয়ে উইকেটকিপারের কাছ দিয়ে চলে গেল এবং ব্যাটার বল স্পর্শ করেননি—এমন পরিস্থিতিতে বাই রান হতে পারে।
৮. লেগ বাই — হাঁটু স্পর্শ
ব্যাটার বল শট খেলতে না পারলেও বল তার শরীরে বা পায়ে লেগে রান হলে সেটি লেগ বাই হতে পারে।
এক্ষেত্রে আম্পায়ার সাধারণত এক হাঁটু স্পর্শ করে লেগ বাইয়ের সিগন্যাল দেন।
৯. ফ্রি হিট — মাথার ওপর হাত ঘোরানো
সীমিত ওভারের ক্রিকেটে নো বলের পরের বল ফ্রি হিট হলে আম্পায়ার এক হাত মাথার ওপর ঘুরিয়ে ফ্রি হিটের সংকেত দিতে পারেন।
ফ্রি হিটে ব্যাটার তুলনামূলক বেশি সুবিধা পান এবং নির্দিষ্ট কিছু আউট ছাড়া তাকে আউট করা যায় না।
১০. পাঁচ রান পেনাল্টি — এক হাত দিয়ে পাঁচ দেখানো
কোনো নিয়মভঙ্গের কারণে একটি দলকে পাঁচ রান পেনাল্টি দেওয়া হলে আম্পায়ার এক হাতের পাঁচটি আঙুল দেখিয়ে সিদ্ধান্ত জানাতে পারেন।
এ ধরনের রান সাধারণ ব্যাটিং রান বা অতিরিক্ত রান থেকে আলাদা হিসেবে গণনা হতে পারে।
১১. শর্ট রান — এক হাত বাঁকিয়ে ইশারা
ব্যাটাররা ক্রিজের মধ্যে দৌড়ানোর সময় কোনো রান সম্পূর্ণ না করলে সেটিকে শর্ট রান বলা হতে পারে।
আম্পায়ার সাধারণত এক হাত বাঁকিয়ে বা কনুইয়ের কাছে নিয়ে শর্ট রানের সংকেত দেন।
১২. ফলাফল — দুই হাত বুকের সামনে ক্রস
ম্যাচ শেষ হওয়ার পর ফলাফল বা ইনিংস/ম্যাচের সমাপ্তি বোঝাতেও আম্পায়ারের নির্দিষ্ট সিগন্যাল থাকে। ম্যাচ পরিস্থিতি অনুযায়ী আম্পায়ার সংশ্লিষ্ট সিদ্ধান্ত ও সমাপ্তির সংকেত ব্যবহার করেন।
আম্পায়ারের সিগন্যাল কেন গুরুত্বপূর্ণ?
ক্রিকেটে মাঠের আম্পায়ারকে একই সঙ্গে খেলোয়াড়, স্কোরার, সম্প্রচারক ও দর্শকদের কাছে সিদ্ধান্ত পরিষ্কারভাবে জানাতে হয়। তাই শুধু মুখে সিদ্ধান্ত বলার পাশাপাশি হাতের সিগন্যাল ব্যবহার করা হয়।
বিশেষ করে বড় আন্তর্জাতিক ম্যাচে স্টেডিয়ামের অনেক দূরে থাকা দর্শক কিংবা টেলিভিশনের দর্শকরা আম্পায়ারের সিগন্যাল দেখেই দ্রুত বুঝতে পারেন কী সিদ্ধান্ত হয়েছে।
এক নজরে আম্পায়ারের গুরুত্বপূর্ণ সিগন্যাল
| সিদ্ধান্ত | আম্পায়ারের সিগন্যাল |
|---|---|
| আউট | এক হাতের তর্জনী ওপরে |
| চার | দুই হাত দুই পাশে |
| ছয় | দুই হাত মাথার ওপরে |
| ওয়াইড | দুই হাত দুই পাশে |
| নো বল | এক হাত পাশে |
| ডেড বল | এক হাতের কবজির ওপর অন্য হাত |
| বাই | এক হাত মাথার ওপরে |
| লেগ বাই | হাঁটু স্পর্শ |
| ফ্রি হিট | মাথার ওপর হাত ঘোরানো |
| শর্ট রান | হাত বাঁকিয়ে ইশারা |
শেষ কথা
ক্রিকেটের আম্পায়ারের সিগন্যাল আসলে খেলার একটি নিজস্ব ভাষা। মাঠে শব্দের ব্যবহার সীমিত হলেও হাতের ইশারার মাধ্যমে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত খুব দ্রুত সবাইকে জানানো যায়।
তাই পরেরবার ক্রিকেট ম্যাচ দেখার সময় আম্পায়ারের হাতের দিকে একটু নজর রাখুন। একটি ছোট ইশারাতেই আপনি বুঝে যেতে পারবেন—চার হয়েছে, ছয় হয়েছে, নো বল হয়েছে নাকি কোনো ব্যাটার আউট হয়েছেন।