বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের ইতিহাসে নায়করাজ রাজ্জাক শুধু একজন জনপ্রিয় অভিনেতার নাম নয়, বরং একটি পুরো যুগের পরিচয়। আজকের তারকাখ্যাতির পেছনে ছিল কঠিন সংগ্রাম, অর্থকষ্ট আর নায়ক হওয়ার অদম্য স্বপ্ন। একসময় স্ত্রী-সন্তানকে নিয়ে অর্থের অভাবে উপোস করতে হয়েছে তাঁকে। অথচ সেই মানুষটিই পরবর্তীতে হয়ে ওঠেন ঢাকাই চলচ্চিত্রের অন্যতম বড় তারকা।
খেলোয়াড় হতে চেয়েছিলেন রাজ্জাক
নায়করাজ রাজ্জাকের জন্ম ১৯৪২ সালের ২৩ জানুয়ারি কলকাতার টালিগঞ্জে। ছোটবেলায় তাঁর স্বপ্ন ছিল খেলোয়াড় হওয়ার। তবে স্কুলজীবনেই অভিনয়ের সঙ্গে তাঁর পরিচয় ঘটে।
সপ্তম শ্রেণিতে পড়ার সময় স্কুলের একটি মঞ্চনাটকে কেন্দ্রীয় চরিত্রে অভিনয়ের সুযোগ পান তিনি। সেই অভিনয়ের অভিজ্ঞতাই তাঁর জীবনের গতিপথ বদলে দেয়। এরপর ধীরে ধীরে অভিনয়ের প্রতি আগ্রহ তৈরি হয়।
মাত্র ২০ টাকা দিয়ে শুরু
কলেজজীবনেই চলচ্চিত্রে অভিনয়ের সুযোগ পান রাজ্জাক। ১৯৫৮ সালে ‘রতন লাল বাঙালি’ ছবিতে ছোট একটি চরিত্রে অভিনয় করেন তিনি। পরে ‘শিলালিপি’ সিনেমার একটি গানের দৃশ্যে অতিরিক্ত শিল্পী হিসেবেও কাজ করেন। সেই কাজের পারিশ্রমিক ছিল মাত্র ২০ টাকা।
তবে টালিগঞ্জে নিয়মিত ছোট চরিত্রে অভিনয় করতে গিয়ে তিনি বুঝতে পারেন, সেখানে তাঁর নায়ক হওয়ার স্বপ্ন পূরণ করা কঠিন হতে পারে। নায়ক হওয়ার ইচ্ছা থেকেই পরবর্তীতে মুম্বাইয়েও যান এবং অভিনয় শেখার চেষ্টা করেন।
১৯৬৪ সালে শূন্য হাতে ঢাকায়
রাজ্জাকের জীবনের সবচেয়ে বড় পরিবর্তন আসে ১৯৬৪ সালে। স্ত্রী খায়রুন্নেসা লক্ষ্মী ও শিশুপুত্র বাপ্পারাজকে নিয়ে তিনি ঢাকায় আসেন। তখন ঢাকায় তাঁর তেমন পরিচিত কেউ ছিলেন না।
পরিবারের স্মৃতিচারণ অনুযায়ী, ঢাকায় এসে একসময় স্টেডিয়াম এলাকার একটি ল্যাম্পপোস্টের নিচেও বসতে হয়েছিল তাঁদের। পরবর্তীতে সেই ল্যাম্পপোস্টই রাজ্জাকের সংগ্রামী জীবনের প্রতীক হয়ে ওঠে।
ঢাকায় তাঁদের ঠিকানাও কয়েকবার বদলেছে—কমলাপুর থেকে দিলু রোড, পরে ফার্মগেট এবং শেষ পর্যন্ত গুলশানে স্থায়ী ঠিকানা তৈরি হয়।
সপ্তাহে আয় ছিল মাত্র ৬০-৬৫ টাকা
ঢাকায় এসে রাজ্জাক টেলিভিশনে অভিনয় করে সংসার চালানোর চেষ্টা করেন। সে সময় তাঁর সাপ্তাহিক আয় ছিল প্রায় ৬০ থেকে ৬৫ টাকা। অথচ মাসে সংসার চালাতে প্রয়োজন হতো প্রায় ৬০০ টাকা।
অর্থকষ্ট এতটাই ছিল যে সন্তানদের দুধ কিনতেই আয়ের বড় অংশ চলে যেত। কখনো কখনো স্ত্রীকে নিয়ে তাঁকে উপোসও করতে হয়েছে। অর্থের অভাবে ফার্মগেট থেকে ডিআইটি টেলিভিশন কেন্দ্রে হেঁটে যাতায়াত করতেন তিনি।
ছোট চরিত্র থেকে ‘বেহুলা’র নায়ক
ঢাকায় চলচ্চিত্রে রাজ্জাকের শুরুটাও হয়েছিল ছোট চরিত্র দিয়ে। ‘আখেরি স্টেশন’ সিনেমায় তিনি সহকারী স্টেশনমাস্টারের চরিত্রে অভিনয় করেন। এরপর বিভিন্ন সিনেমায় অটোরিকশাচালক, পাড়ার ছেলে, আদালতের কর্মচারীসহ নানা ছোট চরিত্রে দেখা যায় তাঁকে।
কিন্তু ছোট চরিত্র তাঁর স্বপ্নকে থামাতে পারেনি। পরিচালক জহির রায়হানের সঙ্গে পরিচয়ের পর জীবনে আসে বড় সুযোগ। জহির রায়হান তাঁকে ‘বেহুলা’ সিনেমার নায়ক হিসেবে নির্বাচিত করেন।
সিনেমাটির জন্য রাজ্জাক সাইনিং মানি হিসেবে পান ৫০০ টাকা। সেই টাকা হাতে পেয়ে তিনি এতটাই আনন্দিত হয়েছিলেন যে সংসারে কিছু খরচ করার পর বন্ধুবান্ধবকে মিষ্টি খাইয়ে উদযাপন করেন।
‘বেহুলা’ বদলে দেয় সবকিছু
‘বেহুলা’ মুক্তির পর রাজ্জাকের জীবনে আসে বড় পরিবর্তন। দর্শক তাঁকে নতুন নায়ক হিসেবে গ্রহণ করে নেয়। এরপর একের পর এক সফল সিনেমায় অভিনয়ের সুযোগ পান তিনি।
ছোট চরিত্রে অভিনয় করা সেই তরুণ ধীরে ধীরে হয়ে ওঠেন ঢাকাই চলচ্চিত্রের সবচেয়ে জনপ্রিয় নায়কদের একজন। তাঁর সঙ্গে কবরী, সুচন্দা, ববিতা, শাবানাসহ জনপ্রিয় অভিনেত্রীদের জুটি দর্শকদের মধ্যে ব্যাপক সাড়া ফেলে।
কীভাবে হলেন ‘নায়করাজ’?
রাজ্জাকের জনপ্রিয়তা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে তাঁর নামের সঙ্গে যুক্ত হয় ‘নায়করাজ’ উপাধি। পরবর্তীতে এই নামেই তিনি বাংলাদেশের চলচ্চিত্রে কিংবদন্তি হয়ে ওঠেন।
তবে নিজের সাফল্যকে কখনো একার অর্জন মনে করতেন না রাজ্জাক। তাঁর মতে, পরিচালক ও সহশিল্পীদের সম্মিলিত প্রচেষ্টাই তাঁকে এত বড় জায়গায় নিয়ে গেছে।
ল্যাম্পপোস্ট থেকে নিজের সাম্রাজ্য
রাজ্জাকের জীবনের সবচেয়ে অনুপ্রেরণাদায়ক বিষয়গুলোর একটি হলো তাঁর সংগ্রাম। যে মানুষটি একসময় ঢাকায় এসে আশ্রয়ের নিশ্চয়তা পাননি, অর্থের অভাবে হেঁটে শুটিংয়ে গেছেন এবং পরিবার নিয়ে না খেয়ে থেকেছেন, পরবর্তীতে তিনিই ঢাকার বুকে নিজের প্রতিষ্ঠান ও বাড়ি গড়ে তোলেন।
উত্তরার ‘রাজলক্ষ্মী’ নামের সঙ্গে তাঁর জীবনের সেই শুরুর স্মৃতিও জড়িয়ে আছে। একটি ল্যাম্পপোস্টের নিচে বসা তরুণের স্মৃতিকে প্রতীকীভাবে প্রতিষ্ঠানের লোগোতে তুলে ধরা হয়েছিল।
আজও স্মরণীয় নায়করাজ
২০১৭ সালের ২১ আগস্ট নায়করাজ রাজ্জাক মারা যান। কিন্তু তাঁর অভিনয়, সিনেমা এবং সংগ্রামের গল্প এখনও বাংলাদেশের চলচ্চিত্রপ্রেমীদের অনুপ্রাণিত করে।
শূন্য হাতে ঢাকায় আসা এক তরুণ কীভাবে নিজের প্রতিভা ও পরিশ্রম দিয়ে চলচ্চিত্রের মহানায়ক হয়ে উঠেছিলেন—রাজ্জাকের জীবন তারই এক অসাধারণ উদাহরণ।