স্পোর্টস ডেস্ক: ক্রিকেট মাঠে একজন খেলোয়াড়কে চেনার অন্যতম সহজ উপায় তার জার্সি। নামের পাশাপাশি জার্সিতে থাকা একটি নির্দিষ্ট নম্বরও হয়ে ওঠে তার পরিচয়ের অংশ। কিন্তু কখনো কি ভেবে দেখেছেন, কেন কোনো ক্রিকেটার ১০ নম্বর, কেউ ৭, আবার কেউ ১৮ বা ৯৬ নম্বর জার্সি পরেন?
আসলে জার্সি নম্বরের পেছনে থাকতে পারে ব্যক্তিগত পছন্দ, জন্মতারিখ, ভাগ্য, পারিবারিক স্মৃতি, ক্যারিয়ারের বিশেষ ঘটনা কিংবা শৈশবের কোনো প্রিয় খেলোয়াড়ের প্রভাব।
ক্রিকেটে জার্সি নম্বরের শুরু কীভাবে?
আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে জার্সি নম্বর জনপ্রিয় হয়ে ওঠে মূলত সীমিত ওভারের ক্রিকেটের প্রসারের সঙ্গে। খেলোয়াড়দের মাঠে ও টেলিভিশনে সহজে শনাক্ত করার জন্য জার্সিতে নম্বর ব্যবহারের প্রচলন বাড়তে থাকে।
বর্তমানে ODI, T20 ও বিভিন্ন ফ্র্যাঞ্চাইজি ক্রিকেটে জার্সি নম্বর একজন খেলোয়াড়ের ব্র্যান্ড পরিচয়েরও অংশ হয়ে গেছে।
তবে টেস্ট ক্রিকেটে দীর্ঘদিন জার্সি নম্বরের প্রচলন ছিল না। ২০১৯ সালে বিশ্ব টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপের সময় খেলোয়াড়দের টেস্ট জার্সিতেও নাম ও নম্বর ব্যবহারের নিয়ম চালু হয়।
জার্সি নম্বর কি ক্রিকেটারের পছন্দেই নির্ধারিত হয়?
অনেক ক্ষেত্রেই ক্রিকেটার নিজের পছন্দের নম্বর বেছে নিতে পারেন। তবে কোনো নির্দিষ্ট নম্বর বেছে নেওয়ার পেছনে ব্যক্তিগত কারণ থাকতে পারে।
কেউ জন্মতারিখের সঙ্গে মিলিয়ে নম্বর বেছে নেন, কেউ ছোটবেলার স্মৃতির কারণে একটি নম্বর ধরে রাখেন। আবার কোনো ক্রিকেটারের কাছে একটি নম্বর সৌভাগ্যের প্রতীক হয়ে উঠতে পারে।
অর্থাৎ, জার্সি নম্বরের জন্য ক্রিকেটে সবার ক্ষেত্রে একই নিয়ম বা একই গল্প নেই।
বিরাট কোহলি—১৮ নম্বরের বিশেষ গল্প
ভারতের তারকা ব্যাটার বিরাট কোহলির জার্সি নম্বর ১৮। এই নম্বরটির সঙ্গে তার জীবনের একটি আবেগপূর্ণ স্মৃতি জড়িয়ে আছে।
কোহলি জানিয়েছেন, তার বাবা প্রেম কোহলি ১৮ ডিসেম্বর মারা যান। তখন তার বয়স ছিল ১৮ বছর। সেই কারণে ১৮ নম্বরটি তার কাছে বিশেষ অর্থ বহন করে এবং পরবর্তীতে এটিই তার ক্রিকেটীয় পরিচয়ের অংশ হয়ে ওঠে।
মহেন্দ্র সিং ধোনি—৭ নম্বর কেন?
ভারতের কিংবদন্তি অধিনায়ক মহেন্দ্র সিং ধোনি দীর্ঘ ক্যারিয়ারে ৭ নম্বর জার্সির জন্য পরিচিত হয়ে উঠেছেন।
ধোনি একাধিকবার জানিয়েছেন, ৭ জুলাই তার জন্মদিন হওয়ায় ৭ নম্বর তার কাছে স্বাভাবিকভাবেই বিশেষ ছিল। জন্মমাস জুলাই বছরের সপ্তম মাস—এই হিসাবও তার পছন্দের সঙ্গে যুক্ত ছিল।
ধোনির সঙ্গে ৭ নম্বর এতটাই পরিচিত হয়ে যায় যে ক্রিকেটে এটি তার ব্র্যান্ড পরিচয়ের অংশ হয়ে ওঠে।
শচীন টেন্ডুলকার—১০ নম্বর
ভারতের কিংবদন্তি শচীন টেন্ডুলকারের নামের সঙ্গে ১০ নম্বর জার্সি ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে। আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে তার দীর্ঘ ক্যারিয়ারে ১০ নম্বর জার্সি ভক্তদের কাছে একটি বিশেষ পরিচয় তৈরি করে।
পরবর্তীতে ভারতের পেসার শার্দুল ঠাকুরও ১০ নম্বর জার্সি পরলেও শচীনের সঙ্গে এই নম্বরের আবেগ এতটাই গভীর ছিল যে ২০১৭ সালে তিনি ১০ নম্বর জার্সি পরার পর সমালোচনার মুখে পড়েন।
বাংলাদেশের ক্রিকেটারদের জার্সি নম্বর
বাংলাদেশের ক্রিকেটেও কয়েকটি জার্সি নম্বর নির্দিষ্ট খেলোয়াড়ের সঙ্গে বিশেষভাবে পরিচিত।
সাকিব আল হাসান দীর্ঘদিন ৭৫ নম্বর জার্সি পরে খেলেছেন। বাংলাদেশের ক্রিকেটে ৭৫ নম্বর বলতেই অনেক ভক্তের কাছে সাকিবের কথা মনে পড়ে।
অন্যদিকে মুশফিকুর রহিম ১৫ নম্বর জার্সির সঙ্গে দীর্ঘদিন ধরে পরিচিত। তার আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারে এই নম্বরটি একটি আলাদা পরিচয় তৈরি করেছে।
মাহমুদউল্লাহ রিয়াদ ৩০ নম্বর জার্সির জন্যও ভক্তদের কাছে পরিচিত। দীর্ঘ ক্যারিয়ারে এই নম্বরটিই তার ক্রিকেটীয় পরিচয়ের অংশ হয়ে উঠেছে।
জার্সি নম্বর কি সবসময় স্থায়ী?
না। একজন ক্রিকেটার চাইলে নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে জার্সি নম্বর পরিবর্তন করতে পারেন। তবে কোনো নম্বরের সঙ্গে দীর্ঘদিনের পরিচয় তৈরি হলে সেটি পরিবর্তন করা অনেক সময় আবেগের বিষয় হয়ে দাঁড়ায়।
আবার অবসর নেওয়া কোনো কিংবদন্তির জার্সি নম্বর নিয়ে দল বা বোর্ড বিশেষ সিদ্ধান্তও নিতে পারে। তবে সব ক্রিকেট বোর্ডে এর নিয়ম এক নয়।
জার্সি নম্বর কীভাবে ব্র্যান্ডে পরিণত হয়?
একজন ক্রিকেটার যখন দীর্ঘদিন একই নম্বর ব্যবহার করেন এবং সেই নম্বরে অসাধারণ সাফল্য পান, তখন নম্বরটি তার ব্যক্তিগত ব্র্যান্ডে পরিণত হয়।
ভক্তরা সেই নম্বরের জার্সি কিনতে শুরু করেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নম্বরটি ব্যবহার করেন এবং অনেক সময় খেলোয়াড়ের নামের বদলে শুধু নম্বর দিয়েই তাকে পরিচিত করা হয়।
এ কারণেই ৭, ১০, ১৮, ৭৫-এর মতো কিছু সংখ্যা ক্রিকেটপ্রেমীদের কাছে শুধু সংখ্যা নয়—নির্দিষ্ট খেলোয়াড়ের পরিচয়ের অংশ।
জার্সি নম্বরের পেছনে কি কুসংস্কারও থাকে?
কিছু ক্রিকেটার নির্দিষ্ট সংখ্যাকে সৌভাগ্যের প্রতীক হিসেবে মনে করেন। আবার কেউ সংখ্যাতত্ত্ব বা ব্যক্তিগত বিশ্বাসের কারণে নির্দিষ্ট নম্বর পছন্দ করেন।
তবে এগুলো ব্যক্তিগত বিশ্বাস; ক্রিকেটের অফিসিয়াল নিয়মে কোনো জার্সি নম্বরকে সৌভাগ্যের বা দুর্ভাগ্যের সংখ্যা হিসেবে নির্ধারণ করা হয়নি।
শেষ কথা
একজন ক্রিকেটারের জার্সি নম্বর অনেক সময় তার ক্যারিয়ারের একটি ছোট কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ গল্প বহন করে। কারও ক্ষেত্রে সেটি জন্মতারিখ, কারও ক্ষেত্রে পরিবারের স্মৃতি, আবার কারও ক্ষেত্রে শুধুই ব্যক্তিগত পছন্দ।
তাই মাঠে কোনো ক্রিকেটারের জার্সির পেছনে থাকা সংখ্যাটি দেখলে সেটিকে শুধু একটি নম্বর হিসেবে না দেখে তার সঙ্গে জড়িয়ে থাকা গল্পটিও মনে রাখা যায়। ক্রিকেটে কখনো কখনো একটি সংখ্যা হয়ে ওঠে একজন খেলোয়াড়ের পুরো পরিচয়ের প্রতীক।